প্রসঙ্গঃ কবর বনাম রওযাহ

মাওলানা মাহবুবুর রহমান নুমানী 

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কবরকে রওযাহ বলা যাবে কি না- সম্প্রতি সোস্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে ৷ আমি অতি বড় কোনো আলিম নই, আবার ওয়াযের মাঠে মঞ্চ কাঁপানো ঝাঁঝালো কোনো বক্তাও নই ৷ তবে ইলমে নববীর একজন নগন্য খাদেম হিসেবে আমি আন্তরিকতা সহকারে আলিমগণের কিতাবে লিখা ইবারতের অর্থ বুঝার বা আলেমগণের কথার মর্মোপলব্ধির চেষ্টা করি ৷ আর এক্ষেত্রে আমি সম্পূর্ণ নির্মোহ থাকতে চাই – এরপরও কোনো ক্ষেত্রে ভুল হয়ে থাকলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকি ৷ এই হিসেবে আজ কবরকে রওযাহ বলা প্রসঙ্গে আমার উপলব্ধিটুকু শেয়ার করলাম ৷

কবর শব্দটি আরবী ৷ এর অর্থ হল-
المكان الذي يدفن فيه الميت سواء كان المدفون فيه مؤمنا او كافرا او فاجرا ـ
অর্থাৎ- কবর এমন স্থানকে বলা হয়- যাতে কোনো মৃত ব্যক্তিকে দাফন (সমাহিত) করা হয় ৷ চাই তাতে দাফনকৃত ব্যক্তি মুমিন হোক বা কাফির হোক বা ফাজির (পাপিষ্ট) হোক ৷
আর মৃত ব্যক্তির লাশ কবরে দাফনের মাধ্যমে পৃথিবীর সাথে তাঁর সম্পর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে; শুরু হয়ে যায় পরকালীন জীবনের প্রথম ধাপ ৷ যাকে পবিত্র কুরআনের ভাষায় বারযাখ বলা হয় ৷ এই জীবন পার্থিব জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ৷ এটা গাইব তথা অদৃশ্যের জগত ৷ দুনিয়ার কোনো কিছুর সাথে তুলনা করে এই জীবনের স্বরূপ কল্পনা করা যাবে না ৷ আর ওহীর মাধ্যম ছাড়া এই জীবন সম্পর্কে কিছু জানারও সুযোগ নেই ৷ এ ব্যাপারে যা কিছু জানা গেছে; তা শুধু ওহী তথা কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমেই জানা গেছে ৷
আখেরাত তথা মৃত্যু পরবর্তী জীবনের প্রথম ধাপ কবরের জীবন সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর এক হাদীসে বলা হয়েছে ـ
القبر روضة من رياض الجنة او حفرة من حفر النار
অর্থাৎ- কবর হচ্ছে বেহেশতের বাগানসমূহের মধ্য থেকে একটি বাগান অথবা দোযখের গর্ত সমূহের মধ্য থেকে একটি গর্ত ৷ (হাদীসটির মর্ম সহীহ) এই হাদীসের মর্মার্থ যে পার্থিব ক্ষেত্রে নয়; বরং পরকালীন জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – তা তো ব্যাখ্যা ছাড়াই বুঝা যায় ৷ আর এই কথাও তো স্পষ্ট যে, মুমিন ব্যক্তির কবরই বেহেশতের বাগান হবে এবং কাফিরদের কবর বেহেশতের বাগান হবে না; বরং কাফিরদের কবরই হবে দোযখের গর্ত ৷ অতএব পরকালীন অবস্থার বিচারে প্রত্যেক মুমিন ব্যক্তির কবরকেই রওযাহ বলা চলে ৷ আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) ছাড়া অন্যসব মানুষের মধ্যে কে মুমিন? আর কে মুমিন নয়- কার কবর বেহেশতের বাগান? আর কারটি নয়- তা তো ওহীর মাধ্যম ছাড়া জানার উপায় নেই ৷ কিন্তু নবীজীর কবর যে বেহেশতের সর্বশ্রেষ্ঠ বাগান- এ ব্যাপারে তো বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশই নেই ৷ অতএব, পরকালীন জীবনের প্রথম স্তর হিসাবে আদবের দিক বিবেচনায় নবী করীম (সঃ) এর কবরকে অবশ্যই রওযাহ বলা চলে ৷ যদিও বাহ্যিক (দুনিয়াবী) দিক থেকে সব কবরকেই কবর বলা হয় ৷
আরেকটি বিষয় খেয়াল করা জরুরী যে, রসূল (সঃ) এরশাদ ফরমায়েছেন-
زوروا القبور فانها تذكر الاخرة / الموت
অর্থাৎ- তোমরা কবরসমূহ যিয়ারত করিও ৷ কেননা এটা তোমাদেরকে আখেরাতের কথা/ মৃত্যুর কথা স্মরণ করাবে ৷

দেখার বিষয় হল- নবীজী এখানে কার কবর যিয়ারত করতে বলেছেন; তা কিন্তু স্পষ্ট নয় ৷ এখন যদি কেউ কোনো কাফির বা মুশরিকের কবর যিয়ারত করতে যায়; আর বলে যে, নবীজী তো আমভাবে কবরসমূহ যিয়ারত করতে বলেছেন ৷ এক্ষেত্রে মুমিনের কবর ও কাফিরের কবর বলে কোনো পার্থক্য করেন নি ৷ কেননা কাফিরদের কবরকেও আরবীতে কবরই বলা হয় ৷ তাছাড়া এই কবরও তো আখেরাতের কথা স্মরণ করায়; তাহলে কেউ কি তার এই কাজকে কবর যিয়ারত হিসেবে মেনে নেবেন ? আমার তো মনে হয় কেউই মেনে নেবেন না ৷

লেখকঃ 
সহকারী  অধ্যাপক (আরবী) , 
শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, পাঠানটুলা, সিলেট। 

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *