সম্পাদকীয় | মুক্তবাংলা নিউজ
রাজধানীর দিয়াবাড়ী এলাকার মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীর শোকাহত ও ব্যথিত। এই দুর্ঘটনায় শিশু-কিশোরদের ভয়াবহ মৃত্যু ও দগ্ধ শরীর দেখে শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবার নয়, সমগ্র জাতি যেন শোকসাগরে নিমজ্জিত। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া আমাদের সম্মিলিত হৃদয়ের ক্ষতকেই প্রতিফলিত করে। সত্যিই, ফুটফুটে শিশুদের পুড়ে যাওয়া দেহাবশেষ আমাদের বিবেক ও বোধে ক্রমাগত আঘাত হানছে।
আমরা মনে করি, এই ট্র্যাজেডি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি। যাঁরা তাদের সন্তানদের নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় পাঠিয়েছিলেন শিক্ষাঙ্গনে, তারা এখন সন্তানের নিথর দেহ বা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি হাসপাতালের বিছানায় অসহায় চোখে চেয়ে আছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া উচিত ছিল তাদের জন্য একটি অনির্বাণ ভবিষ্যতের দ্বার। অথচ আকাশ থেকে নেমে আসা আগুন সেখানে নেমে এলো মৃত্যু ও ত্রাস নিয়ে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে ছয়টি সামরিক বিমান দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। প্রশ্ন উঠছে—প্রশিক্ষণ বিমানের ক্ষেত্রে যথাযথ মান যাচাই, আগাম যন্ত্র পরীক্ষা ও জরুরি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কি যথেষ্ট ছিল না? কেনই বা প্রশিক্ষণ ফ্লাইট একটি জনবহুল এলাকায় পরিচালিত হলো? মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজের আশেপাশে হাজারো ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত, এবং এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই আবাসিক ও শিক্ষামুখী এলাকা হিসেবে পরিচিত। প্রশ্ন আরও জোরালো হয়, যখন জানা যায়, এই প্রশিক্ষণ ফ্লাইটটি ছিল ‘একক’ অর্থাৎ পাইলট একাই ছিলেন বিমানে।
আমরা স্বাগত জানাই যে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তদন্ত কমিটি যেন কেবল দায়সারা প্রতিবেদন বা ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ দিয়ে দায় শেষ না করে, বরং দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সংস্থার দিকে আঙ্গুল তুলতে পারে—এমনটাই জাতির প্রত্যাশা।
এই ঘটনায় অন্তত ১৯ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। আহত শতাধিক শিশু ও শিক্ষক এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে দায় ও ব্যর্থতা এড়িয়ে নয়—রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করতে হবে। নিরাপদ আকাশ এবং নিরাপদ শিক্ষাঙ্গনের দাবি এখন বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই—যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির মতোই সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও ফায়ার সার্ভিসের দ্রুত তৎপরতায় আহতদের উদ্ধার এবং হাসপাতালে স্থানান্তর নিশ্চিত করা গেছে। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতার মনোভাবও প্রশংসার দাবি রাখে।
তবুও এই বিপর্যয়ের পর শুধুমাত্র শোকাহত হয়ে চুপ করে থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রকে এখনই বলিষ্ঠ, কার্যকর ও জনমনকে আস্থাবান করে এমন নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে—যাতে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আর কখনো আগুনবাহী আকাশযান দ্বারা আক্রান্ত না হয়।
পরিবার হারানো শিশুদের জন্য এখন কিছুই যথেষ্ট নয়। তবে ভবিষ্যতের শিশুরা যাতে এমন ভয়াবহ মৃত্যুর মুখে না পড়ে, সেই নিশ্চয়তা দিতেই হবে—এই আমাদের জাতিগত দায়িত্ব।
— মুক্তবাংলা নিউজ সম্পাদকীয় পরিষদ
২২ জুলাই ২০২৫ | ঢাকা
