সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা যেন এক অনন্য ইলমি আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও আত্মিক আবেগে পরিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক ও মুফতি মাওলানা মাহবুবুর রহমান নুমানী (হাফি.) রচিত গবেষণাধর্মী গ্রন্থ “আল-মুখতারাত”-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠান। মাদরাসার হল রুমে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ, সিলেট।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই পবিত্র কুরআনের সুমধুর তিলাওয়াত করেন মাওলানা জাফর আহমদ। কুরআনের আয়াতের ধ্বনিতে হলরুমে নেমে আসে গভীর প্রশান্তি। এরপর ইসলামী সংগীত পরিবেশন করেন মোঃ জসীম উদ্দিন, যা উপস্থিত অতিথি ও শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে আলাদা এক আবেগের ছোঁয়া দেয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য মাওলানা মোঃ লুৎফুর রহমান হুমায়দী। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “আল-মুখতারাত একটি সময়োপযোগী ও গভীর গবেষণাভিত্তিক গ্রন্থ। এমন ইলমি কাজ একটি প্রতিষ্ঠানের সম্মান ও ঐতিহ্যকে আরও উজ্জ্বল করে।” তিনি লেখকের ইলমি সাধনা ও নিষ্ঠার জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন গোবিন্দনগর ফজলিয়া ফাজিল মাদরাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আব্দুস সালাম আল-মাদানি। তিনি বলেন, “মুফতি মাহবুবুর রহমান নুমানী যে শ্রম, অধ্যয়ন ও গভীর চিন্তার মাধ্যমে এই গ্রন্থ রচনা করেছেন, তা আজকের প্রজন্মের আলেমদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।” তিনি গ্রন্থটির গবেষণামূলক দিক ও ইলমি গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জামেয়ার উপাধ্যক্ষ এবং সেন্টার ফর ইসলামিক রিসার্চ, সিলেট-এর সহ-সভাপতি মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার। সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, এই ধরনের গ্রন্থ প্রকাশনা ইসলামী গবেষণার ধারাকে বেগবান করে এবং ছাত্রদের মধ্যে ইলমি আগ্রহ সৃষ্টি করে।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামেয়ার উপাধ্যক্ষ (অতিরিক্ত) মাওলানা কমর উদ্দিন। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন প্রিন্সিপাল মখছুছুল করীম চৌধুরী, জামেয়ার সহকারী অধ্যাপক মাওলানা আব্দুন নুর, মদীনা মার্কেট জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মাহফুজ আহমদ, জামেয়ার মর্ণিং শিফটের ইনচার্জ মাওলানা আবু সালেহ মুহাম্মদ আলা উদ্দিন এবং প্রভাষক মাওলানা মোঃ নাজমুল হুদা তোফায়েল। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যেই “আল-মুখতারাত”-এর ইলমি মূল্য, পাঠকসমাজে এর প্রয়োজনীয়তা এবং ইসলামী জ্ঞানের ধারাবাহিকতায় এর অবদান স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
এ সময় গ্রন্থের লেখক মুফতি মাওলানা মাহবুবুর রহমান নুমানী (হাফি.) তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলেন, এই গ্রন্থ রচনার পেছনে যাঁরা তাঁকে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও দোয়া দিয়ে সহযোগিতা করেছেন, তাঁদের সকলের প্রতি তিনি আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, “আল-মুখতারাত” মূলত তিনি বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সমসাময়িক নানা মাসায়ালা নিয়ে যে লেখালিখি করতেন, তারই একটি সুসংগঠিত সংকলন। সাধারণ মানুষের বাস্তব প্রশ্ন ও সময়ের প্রয়োজন বিবেচনায় লেখা সেই মাসায়ালাগুলো পাঠকদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় তিনি সেগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
তিনি বলেন, অনেক শুভানুধ্যায়ী তাঁকে বারবার অনুরোধ করেছেন যেন এসব লেখা সংরক্ষিত থাকে এবং বৃহত্তর পাঠকসমাজ উপকৃত হয়। সেই দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা থেকেই এই গ্রন্থের জন্ম। তিনি আশা প্রকাশ করেন, “আল-মুখতারাত” আলেম সমাজ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য উপকারী হবে। শেষপর্যায়ে তিনি আল্লাহর দরবারে কবুলিয়াত কামনা করেন এবং যেকোনো ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান।
পুরো অনুষ্ঠানটি দক্ষতার সঙ্গে সঞ্চালনা করেন হাফিজ মাওলানা মুফতি শফিকুর রহমান। শেষপর্যায়ে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
এই প্রকাশনা অনুষ্ঠান শুধু একটি বইয়ের আত্মপ্রকাশ ছিল না। এটি ছিল ইলমের প্রতি ভালোবাসা, গবেষণার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের ইলমি ঐতিহ্যকে নতুন করে স্মরণ করার এক আবেগঘন উপলক্ষ। “আল-মুখতারাত” নিঃসন্দেহে ইসলামী গবেষণায় একটি মূল্যবান সংযোজন হয়ে আলেম সমাজ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে দীর্ঘদিন আলো ছড়াবে।
