✍️ মুক্তবাংলা প্রতিবেদন
১৮ জুলাই ২০২৪। কোটা সংস্কার আন্দোলনের ডাকে ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঢাকায় রূপ নেয় ভয়াবহ সংঘাতে। উত্তরা, মহাখালী, মিরপুর, ধানমণ্ডি, প্রগতি সরণিসহ রাজধানীর প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ হয়। দিনভর সংঘাতে নিহত হন কমপক্ষে ৩১ জন, যাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এবং পথচারী।
উত্তরায় বর্বরতা, যমুনার ক্যামেরায় গাড়ি চাপা
বেলা ১১টার দিকে উত্তরা এলাকায় আন্দোলনকারীরা সড়ক অবরোধ করলে শুরু হয় পুলিশি অভিযান। টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। শিক্ষার্থীরা পাল্টা ইট-পাটকেল ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশের গাড়ি একাধিক শিক্ষার্থীকে চাপা দেয়, যা সরাসরি ধারণ করে যমুনা টেলিভিশনের ক্যামেরা।
এই এলাকায় ৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রুয়েটের ছাত্র মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ।
আগুনে পুড়ল অফিস, বাস, পুলিশ বক্স
মহাখালীতে সংঘর্ষ চলাকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানী সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে পুলিশ বক্সে আগুন দেয় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। গোলচত্বরের নিচে বাসে আগুনের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে মেট্রোরেল স্টেশনে, ফলে বন্ধ হয়ে যায় অন্তত চারটি মেট্রো স্টেশন।
ফারহান ফাইয়াজের মৃত্যুতে শোকের ছায়া
ধানমণ্ডিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রাজধানীর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ। এ সময় সংঘর্ষের মাঝে পড়ে প্রাণ হারান দুই সাংবাদিক, যাদের একজন ঢাকা টাইমসের মেহেদি হাসান।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে গুলি, হেলিকপ্টার থেকে হামলা
প্রগতি সরণি ও গুলশান এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেয় বেসরকারি চার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়।
অন্যদিকে, র্যাব হেলিকপ্টারে পালিয়ে গিয়ে উপর থেকে গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে দেয় আন্দোলনকারীদের দিকে। এতে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ে।
রাজধানী বিচ্ছিন্ন, ইন্টারনেট বন্ধ
বেলা ১২টার পর থেকেই ঢাকার সঙ্গে অধিকাংশ জেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রাত ৯টার পর থেকে ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সারারাত সংঘর্ষ চলতে থাকে।
বিজিবি মোতায়েন, টেলিভিশন ভবনে হামলা
রাতভর উত্তপ্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ভোরে যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়া এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রধান কার্যালয়ে হামলা চালায়, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
সরকারের সুর নরম, আন্দোলনকারীদের প্রত্যাখ্যান
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সরকার নীতিগতভাবে কোটা সংস্কারে একমত হওয়ার কথা জানায়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জানান, সরকার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।
কিন্তু আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ জানান, “গুলি আর সংলাপ একসাথে চলতে পারে না।” একইসঙ্গে নাহিদ ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, “শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ নয়।”
দেশব্যাপী প্রতিবাদ ও ক্ষোভ
১৮ জুলাইয়ের এই ঘটনায় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। নরসিংদী, চট্টগ্রাম, সাভার, মাদারীপুর, রংপুর ও সিলেটে নিহত হন আরও ৮ জন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) তথ্য অনুযায়ী, এদিন মোট ৩১ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে সাংবাদিক ও ছাত্রও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস নাগরিকদের সতর্কতা জারি করে।
