গলা ও বুক জ্বালাপোড়া সমস্যা: কেন হয় এবং প্রতিরোধে করণীয়

গলা বা বুক জ্বালাপোড়া, টক বা তিতা ঢেকুর, খাবার উপরে উঠে আসা, গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, খাবার গিলতে কষ্ট, এমনকি স্বর ভাঙা—এসব উপসর্গে হরহামেশাই মানুষজন ভোগেন। এগুলো একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও কাজের সক্ষমতাকে ব্যাহত করে। ইএনটি চিকিৎসায় আমরা অনেক সময় গলা পরীক্ষা করে কোনো ক্ষত, প্রদাহ বা সিরিয়াস প্যাথলজি না পেলে এসব সমস্যার মূল কারণ হিসেবে GERD (Gastroesophageal Reflux Disease) শনাক্ত করি।

১৯৯৯ সাল থেকে প্রতি নভেম্বর মাসে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে GERD সচেতনতা সপ্তাহ। এ বছরও ২৩–২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে GERD Awareness Week ২০২৫।
এই বছরের থিম: “চলুন GERD নিয়ে কথা বলি”—যা রোগীর উপসর্গ, চিকিৎসা ও ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করার গুরুত্বকে আরও জোরদার করে।

বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০০ জনের প্রায় ১৫ জন GERD-এ ভুগছেন। ইউরোপ ও আমেরিকায় এর প্রকোপ বেশি হলেও এশিয়ায়, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায়, রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। প্রতিরোধ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণেই অনেক রোগী জটিলতায় পড়েন এবং দীর্ঘদিন ওষুধ নির্ভর থাকতে হয়।

গলা-বুক জ্বালাপোড়া কেন হয় ? 

‘গ্যাস্ট্রো’ বলতে পাকস্থলী আর ‘ইসোফেগাস’ বলতে খাদ্যনালিকে বোঝায়। সাধারণত খাবার খাদ্যনালি দিয়ে নিচের দিকে পাকস্থলীতে নামে। কিন্তু কোনো কারণে এই স্বাভাবিক পথ ব্যাহত হলে পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালির ওপরের দিকে উঠে আসে। এই অ্যাসিডই গলা ও বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুরসহ নানা উপসর্গ তৈরি করে।

যাদের GERD হওয়ার ঝুঁকি বেশি:

👉যারা অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভোগেন

👉যারা ধূমপান করেন

👉যারা একবারে অনেক পরিমাণে খাবার খান

👉যারা খাবারের পরপরই শুয়ে পড়েন

👉যাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশি তেলেভাজা ও মশলাযুক্ত খাবার থাকে।

👉কোমল পানীয় ও অনিয়মিত কফি সেবন করলে

👉গর্ভবতী নারীদের—পেটে চাপ বাড়ায় বলে ঝুঁকি বেশি থাকে।

প্রতিরোধে যা করবেন :

✔ একবারে বেশি খাবেন না—দিনে অল্প অল্প করে ভাগ করে খাবেন।
✔ খাবার ভালো করে চিবিয়ে খান।
✔ ডিনার শোবার অন্তত ২ ঘণ্টা আগে খাবেন।
✔ মানসিক চাপ কমান—স্ট্রেস বাড়লে অ্যাসিড নিঃসরণও বাড়ে।
✔ ঢিলেঢালা পোশাক পরুন, বিশেষত রাতে।
✔ ভরা পেটে ব্যায়াম এড়িয়ে চলুন।
✔ অ্যাসপিরিন/ব্যথানাশকসহ কিছু ওষুধ উপসর্গ বাড়াতে পারে—চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করুন।
✔ খাবার পর শোবার সময় মাথার দিক সামান্য উঁচুতে রাখুন।
✔ প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।

চিকিৎসা :

যদি—

বারবার এই সমস্যা দেখা দেয়,
২–৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়,
স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত করে
তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনে চিকিৎসক প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর (PPI) সহ প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

নাক-কান-গলার চিকিৎসায় GERD কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অনেকেই মনে করেন GERD (Gastroesophageal Reflux Disease) শুধু পেটের রোগ। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব নাক-কান-গলা—বিশেষ করে গলা ও ল্যারিঞ্জের ওপর—খুবই গভীর। এই অবস্থাকে বলা হয় Laryngopharyngeal Reflux (LPR), যেখানে পাকস্থলীর অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে গলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন নাক-কান-গলার বিভিন্ন সমস্যা তৈরী করে।
যেমন—
দীর্ঘস্থায়ী স্বরভাঙা,
ক্রনিক কাশি,
গলা ব্যথা সাথে জ্বালা,
গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি।

অনেক সময় ENT পরীক্ষা স্বাভাবিক হলেও GERD বা LPR-ই এসব উপসর্গের মূল কারণ হিসেবে ধরা পড়ে।GERD প্রতিটি ইএনটি ক্লিনিকের নীরব
সঙ্গী।
অবহেলা করলে GERD জটিল অবস্থায় যেতে পারে, তবে সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসায় অধিকাংশই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

সচেতন থাকি—সুস্থ থাকি :

GERD কোনো আতংকের বিষয় নয়, আবার অবহেলারও নয়।
উপসর্গকে গুরুত্ব দিন, প্রয়োজনে চিকিৎসককে দেখুন, এবং জীবনযাত্রায় ছোট পরিবর্তন আনুন।

ভালো থাকি, ভালো রাখি।

লেখক:

ডা. মো. আব্দুল হাফিজ (শাফী)
আবাসিক সার্জন (ইএনটি), সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *