মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। ইরানের রাজধানী তেহরান ও কাতারের রাজধানী দোহায় জোরালো বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে। সংস্থাটির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, দোহা শহরের আকাশে দূরে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। এই ঘটনার পর শুরু হওয়া সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এতে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে সমুদ্রপথে বাণিজ্য ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও বিস্তার লাভ করেছে। শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানি একটি যুদ্ধজাহাজে টর্পেডো হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে একটি ড্রোন হামলায় বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আজারবাইজান প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হামলার জবাব দিতে প্রয়োজনীয় প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে নতুন করে আরেকটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
লেবাননে ইরানসমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে ইসরাইলি হামলায় রাজধানী বৈরুতের বিভিন্ন এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এএফপিটিভির ছবিতে দেখা গেছে, বহু ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং আকাশে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠছে।
অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, তারা ইরাকভিত্তিক কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। এ সময় ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করে তাদের ইরানে অনুপ্রবেশে সহায়তা করছে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়া ওই অঞ্চলে দুটি সামরিক বিমান মোতায়েন করেছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, পরিস্থিতি প্রয়োজন হলে কানাডার সশস্ত্র বাহিনীও যুদ্ধে অংশ নিতে পারে।
এদিকে ন্যাটো সদস্য তুরস্কের আকাশসীমার দিকেও সংঘাতের প্রভাব পড়েছে। জোটটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুরস্কের দিকে ধেয়ে আসা একটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে। এ ঘটনায় তুরস্ক ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে।
বৃহস্পতিবার তেহরানে হামলার পর প্রকাশিত এএফপিটিভির ছবিতে পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও ক্ষতিগ্রস্ত ভবন দেখা গেছে। কিছু এলাকায় তখনও ধোঁয়া উঠছিল।
তেহরানের ৩০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা এএফপিকে বলেন, “আমরা ইতিহাসের খুব গুরুত্বপূর্ণ এক সময় পার করছি। আমি ভয় পাই না। এখন আমাদের কাছে একমাত্র জিনিস হলো আশা।”
ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৪৫ জন সামরিক সদস্য ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে এএফপি।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ফুটবল স্টেডিয়াম, পৌর ভবন এবং বহু দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানে ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় এক শতাংশ ক্ষমতায় নেমে এসেছে। ফলে দেশটি কার্যত বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
ইসরাইলি সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফরিন বলেছেন, তাদের লক্ষ্য হলো ইরানের সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং সম্ভাব্য হুমকি সম্পূর্ণভাবে দূর না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়া।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাৎজ জানান, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানে ওয়াশিংটনের দৃঢ় সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কতা জারি হওয়ার পর জেরুজালেমে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরে বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।
লেবাননে ইসরাইল জানিয়েছে, দক্ষিণ বৈরুতে হিজবুল্লাহর কয়েকটি কমান্ড সেন্টারে হামলা চালানো হয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ভোরের দিকে একটি ড্রোন হামলায় ত্রিপোলির কাছে বেদ্দাভি শরণার্থী শিবিরে হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল-আলি ও তার স্ত্রী নিহত হয়েছেন।
লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার থেকে দেশটিতে অন্তত ৭২ জন নিহত, ৪৩৭ জন আহত এবং প্রায় ৮৩ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় ধনী রাজতন্ত্রগুলোতেও পড়েছে। সংঘাত শুরুর পর উপসাগরীয় দেশগুলোতে অন্তত ১৩ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে কুয়েতের ১১ বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে।
কাতার জানিয়েছে, দোহায় তীব্র বিস্ফোরণের মধ্যেই তারা একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করেছে। এর আগে হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে চালানো হামলাও প্রতিহত করা হয়।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে ভূপাতিত একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সময় তৈরি করতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে।
ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, কুয়েত উপকূলে একটি তেলবাহী জাহাজে বড় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়েছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় দক্ষিণ কোরিয়া ৬৮ বিলিয়ন ডলারের বাজার স্থিতিশীলতা তহবিল সক্রিয় করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে চীন তাদের তেল শোধনাগারগুলোকে ডিজেল ও পেট্রোল রপ্তানি বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে বলে জানা গেছে।
সংঘাতের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। জর্ডানের উত্তরাঞ্চলের ইরবিদ শহরের ট্যুর গাইড নাজিহ রাওয়াশদেহ বলেন, “তিন দিন আগে আমার শেষ পর্যটক দল চলে গেছে। মার্চে আসার কথা ছিল এমন সব দল তাদের সফর বাতিল করেছে। এখানকার পর্যটন মৌসুম এখনই শুরু হওয়ার কথা ছিল। এটি সত্যিই বিপর্যয়কর।”
