শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড: ঘটনা, কারণ ও ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রশ্ন

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনি একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হামলায় নিহত হন। তবে তাঁর হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজও নানা আলোচনা, গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের অধিকাংশের মতে কিছু বিষয় নিশ্চিত হলেও, কিছু প্রশ্নের এখনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি।

জিয়াউর রহমানকে কারা হত্যা করে?

সরকারি ও ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থানরত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশ হত্যা করে। হামলায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান, মেজর এস. এম. খালেদ, মেজর মোজাফফর হোসেনসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন।

ঘটনার সময় জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে। সেই সুযোগে বিদ্রোহী কর্মকর্তারা সার্কিট হাউস ঘিরে হামলা চালায় এবং তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

কেন হত্যা করা হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একক মত নেই। তবে কয়েকটি প্রধান ব্যাখ্যা বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

১. সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ

১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে একাধিক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। এই সময়ে সেনাবাহিনীর অনেক কর্মকর্তা শাস্তি, বদলি বা পদাবনতির শিকার হন। ফলে সেনাবাহিনীর একটি অংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে গবেষকরা মনে করেন।

২. জেনারেল আবুল মনজুরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব

Abul Manzoor-কে এই বিদ্রোহের প্রধান সংগঠক হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও সামরিক মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। চট্টগ্রামে তাঁর প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য।

হত্যাকাণ্ডের পর মনজুর রেডিওতে ভাষণ দেন এবং সেনাবাহিনীতে পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি গ্রেপ্তার হন এবং পরে রহস্যজনকভাবে নিহত হন।

৩. ক্ষমতার লড়াই ও রাজনৈতিক অস্থিরতা

সত্তরের দশকের শেষভাগ ও আশির দশকের শুরুতে বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল অত্যন্ত অস্থির। সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ছিল সেই ক্ষমতার দ্বন্দ্বেরই একটি পরিণতি।

জেনারেল মনজুর কি মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন?

সরকারিভাবে জেনারেল মনজুরকে ষড়যন্ত্রের অন্যতম নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই তিনি নিহত হন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাইয়ের সুযোগ হয়নি। এ কারণে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে বিকল্প তত্ত্ব ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের পর কী ঘটে?

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিদ্রোহ দ্রুত দমন করা হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান Hussain Muhammad Ershad সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন এবং বিদ্রোহী বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। পরে সামরিক আদালতে বিচার শেষে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর উপরাষ্ট্রপতি Abdus Sattar ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তবে এক বছরেরও কম সময় পরে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন।

বিতর্ক ও অনুত্তরিত প্রশ্ন

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, লেখক ও গবেষক ভিন্ন ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ মনে করেন এটি ছিল সীমিত পরিসরের সামরিক বিদ্রোহ, আবার কেউ বৃহত্তর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব দাবির অনেকগুলোর পক্ষে চূড়ান্ত ও সর্বজনস্বীকৃত প্রমাণ নেই। ইতিহাসের গবেষণায় তাই নিশ্চিত তথ্য ও রাজনৈতিক মতামতকে আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

উপলব্ধ ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হন। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, জেনারেল মনজুরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতা হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে ঘটনাটির কিছু দিক এখনো বিতর্কিত এবং ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয় হয়ে আছে।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *