বাংলা ভাষায় আরবি ও ফারসি শব্দের ব্যবহার নিয়ে চলমান বিতর্ক নতুন নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক শিবির নেতা ও চিন্তক ড. মির্জা গালিব। নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে এক স্ট্যাটাসে তিনি দাবি করেন, এই বিতর্কের শিকড় বহু পুরোনো এবং এর সঙ্গে বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত।
ড. গালিব তার বক্তব্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একসময় এই শব্দ ব্যবহারে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং ‘রক্ত’ শব্দকে অধিক “ভাল বাংলা” ও কাব্যিক বলে বিবেচনা করেছিলেন। তবে ড. গালিবের মতে, যারা বাংলা ভাষার তথাকথিত বিশুদ্ধতার কথা বলেন, তারা নজরুলের মতো মহররম কিংবা মুসলিম সমাজের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বিষয় নিয়ে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য রচনা করেননি। তিনি আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক চর্চায় শিবাজি থাকলেও ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) অনুপস্থিত থেকেছেন, যা এক ধরনের সাংস্কৃতিক অসমতার ইঙ্গিত দেয়।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলা ভাষার ‘পিউরিটি’ বা বিশুদ্ধতার প্রশ্ন তুলে একটি গোষ্ঠী মূলত বাঙালি মুসলমানকে তার ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। তার ভাষায়, ইসলামী সংস্কৃতিকে বাদ দিলে যে বাংলা সংস্কৃতি অবশিষ্ট থাকে, তা অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস উল্লেখ করে ড. গালিব বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সূচনালগ্নে ‘তমুদ্দুন মজলিশ’ নামের একটি ইসলামী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৪৭ সাল থেকেই তারা পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে একাডেমিক আলোচনা শুরু করে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ভাষা আন্দোলনে শহীদদের নাম—সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার—সবই আরবি-ফারসি উৎস থেকে আগত, যা বাঙালি মুসলমানের জীবন ও ইসলামের পারস্পরিক সম্পর্ককে স্পষ্ট করে।
ড. গালিব আরও বলেন, যেমনভাবে ‘স্কুল’ বা ‘ইউনিভার্সিটি’ শব্দ আজ বাংলার স্বাভাবিক অংশ হয়ে গেছে, তেমনি নামাজ, রোজা, মোনাজাত ও দোয়ার মতো শব্দও বাঙালি মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে বাংলা শব্দ হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজনৈতিক ভাষা ও স্লোগান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইনকিলাব, আজাদি ও ইনসাফ শব্দগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। বর্তমান প্রজন্ম এই শব্দগুলোর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থান ও নিজস্ব বিশ্বাসের মধ্যে এক ধরনের সংযোগ তৈরি করছে। তার মতে, নতুন শব্দ ও স্লোগানের মাধ্যমেই নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস রচিত হয়। যারা পরিবর্তন চায় না বা পুরোনো চেতনার রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে আগ্রহী, তারাই এসব শব্দ ও স্লোগানের বিরোধিতা করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে ড. মির্জা গালিব জনগণকে এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে নিজেদের বিশ্বাস ও অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
