সিলেট প্রতিনিধি:
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেকের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংযম ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, পাঠানটুলা, সিলেটের উপাধ্যক্ষ সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার।
সোমবার (৫ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি ‘মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেক ও আলেমদের কাছে জাতির প্রত্যাশা’ শিরোনামে এসব কথা বলেন।
স্ট্যাটাসের শুরুতে সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার মুফতি মাওলানা আব্দুল মালেককে একজন সম্মানিত, নিভৃতচারী গবেষক ও কিতাবি আলেম হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর ইলমি যোগ্যতা সর্বজনস্বীকৃত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুফতি আব্দুল মালেকের প্রচারিত কিছু বক্তব্য নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। সেখানে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানকারীদের ‘নসীব খারাপ’ এবং কওমি অঙ্গনের সবাই জামায়াতে যোগ দিলেও জামায়াত ‘গোমরাহ’ থাকবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন তিনি।
এ ধরনের বক্তব্যের পর জামায়াতপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকর্মীদের একাংশের সমালোচনা এবং মুফতি আব্দুল মালেকের সমর্থকদের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার কথাও তুলে ধরেন সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার।
তিনি বলেন, কোনো আলেমের ইলমি মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাঁর উদ্দেশ্য নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় আলেমসমাজের সামনে কিছু প্রশ্ন রাখা প্রয়োজন।
বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ হওয়ায় সেখানে বিভিন্ন মত ও রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ নামাজ আদায় করেন উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, কোনো বিশেষ বিষয়ে জামায়াতের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পুরো সংগঠনকে ‘গোমরাহ’ আখ্যা দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত।
ইসলামী অঙ্গনের বিভিন্ন মতপার্থক্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি কওমি, সুন্নি, সালাফি ও আহলে হাদিসসহ বিভিন্ন ধারার মধ্যে বিদ্যমান পারস্পরিক বিরোধের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর প্রশ্ন, এসব মতপার্থক্যের সমাধান কি পারস্পরিক আক্রমণ ও বিভেদের মাধ্যমে হবে, নাকি ইলমি আলোচনা ও যুক্তিনির্ভর জবাবের মাধ্যমে।
জামায়াতে ইসলামীকে ‘গোমরাহ’ বলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলেমদের বক্তব্য ও ঐতিহাসিক অবস্থান পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন দেওবন্দি ও অন্যান্য আলেমের নাম উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, যারা বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের পক্ষে বই লিখেছেন বা তাদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের অবস্থান কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
মুফতি আব্দুল মালেকের ইলমি মর্যাদা স্বীকার করে সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার প্রশ্ন করেন, একজন বড় আলেম কোনো সংগঠনকে গোমরাহ বললে সেই সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য বড় আলেমদের অবস্থান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইলমি মতপার্থক্য আহলে ইলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে ইলমি জবাবের মাধ্যমে সমাধান করা উত্তম। এসব বিষয় সাধারণ মানুষের সামনে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়, যাতে মুসলিম সমাজে বিভেদ ও পারস্পরিক বিদ্বেষ বাড়ে।
আলেমদের পারস্পরিক ভাষা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কোনো দলের সব আলেমকে অন্য কোনো আলেমের ‘জুতা বহনের যোগ্য নন’ বলে মন্তব্য করার মতো ভাষা ভদ্রতা ও শালীনতার কোন সীমারেখায় পড়ে, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে বিভিন্ন দল-মতের আলেম-উলামা ও ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের কাছাকাছি এসেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর আবার পারস্পরিক বিরোধ ও কাদা ছোড়াছুড়ি বেড়ে গেলে তা নিয়ে নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ইতিবাচক দিকও বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষকে ইসলামের পথে আনা, নামাজে উদ্বুদ্ধ করা, কোরআন-হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য পাঠে উৎসাহিত করা, সমাজে ইসলামী চরিত্র গঠন এবং বিভিন্ন জাতীয় ও ধর্মীয় ইস্যুতে ভূমিকা রাখার মতো কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতকে অন্তত ইতিবাচক মূল্যায়নের সুযোগ আছে কি না, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অতীতে বিভিন্ন জাতীয় ও ইসলামিক ইস্যুতে কওমি ও দেওবন্দি আলেমদের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে জামায়াতের কোনো ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তা সংশোধনের জন্য দায়িত্বশীল ও আন্তরিক পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা উচিত বলেও মত দেন।
‘কার নসীব ভালো, কার নসীব খারাপ’ তা নির্ধারণের বিষয়ে প্রশ্ন তুলে সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার বলেন, এ ধরনের মন্তব্য করা কতটা যথাযথ, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হলেই কাউকে গোমরাহ বলা হলে অন্য রাজনৈতিক বা সেক্যুলার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও একই ধরনের ধর্মীয় মূল্যায়ন থাকা উচিত কি না, সে প্রশ্নও রাখেন তিনি।
স্ট্যাটাসের শেষাংশে দেশের বর্তমান সংকট ও বিভেদের প্রসঙ্গ তুলে সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার বলেন, এখন অনৈক্য ও বিভেদের সময় নয়। আলেম-উলামাদের পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য, সামাজিক শান্তি ও জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
