সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে মুসলিমদের জয়, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজার পক্ষে সোচ্চার নেতাদের অগ্রগতি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশটির কংগ্রেসের দুই কক্ষ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত সাতজন মুসলিম আইনপ্রণেতা নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন এবং চারজন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এ বিজয়কে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের পরাজিত করে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ, উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
নির্বাচনে বিজয়ী মুসলিম আইনপ্রণেতাদের প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নাগরিক অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, মানবিক সহায়তা এবং পররাষ্ট্রনীতি। তাঁদের কয়েকজন গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইসরাইলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য আবদুল এল-সাইয়েদ
মিশিগান থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সাইয়েদ রিপাবলিকান দলের সাবেক প্রতিনিধি মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। ৪২ বছর বয়সী এই চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এল-সাইয়েদ অবসরপ্রাপ্ত সিনেটর গ্যারি পিটার্সের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ী হন। নির্বাচনী প্রচারে তিনি ইসরাইলকে নিঃশর্ত মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের বিরোধিতা করেন এবং গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেন। প্রচারণার সময় তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে পড়তে হয়।
নিউ জার্সির প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি আদম হামাউয়ি
নিউ জার্সির ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আদম হামাউয়ি রিপাবলিকান গ্রেগ মেলেকে পরাজিত করেছেন। ৫৬ বছর বয়সী এই প্লাস্টিক সার্জন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক সামরিক চিকিৎসক। ইরাক যুদ্ধে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০২৪ সালে গাজার ইউরোপীয় হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিউ জার্সি থেকে প্রথম মুসলিম প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেসে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে সবার জন্য মেডিকেয়ার স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও শিক্ষাঋণ মওকুফ এবং অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) বিলুপ্ত করার পক্ষে কথা বলেন হামাউয়ি। পাশাপাশি ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
নিউইয়র্কে জয়ী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে
নিউইয়র্ক থেকে প্রতিনিধি পরিষদের আসনে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী দারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ে। নাগরিক অধিকারবিষয়ক তদন্তকারী ও ডক্টরাল পর্যায়ের এই শিক্ষার্থী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনে তিনি ৮৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন।
এর আগে দলের প্রাথমিক নির্বাচনে দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি আদ্রিয়ানো এসপাইয়াতকে পরাজিত করে আলোচনায় আসেন তিনি। তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কাজ করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
পুনর্নির্বাচিত চার মুসলিম আইনপ্রণেতা
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের আরও চার মুসলিম সদস্য পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসে মুসলিম প্রতিনিধিত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে।
রাশিদা তালিব (মিশিগান): ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট রাশিদা তালিব মিশিগানের ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস হুপারকে পরাজিত করেন। কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য হিসেবে তিনি বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।
ইলহান ওমর (মিনেসোটা): মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। তিনি রিপাবলিকান জন নাগেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ডিভেল জ্যাকসনকে পরাজিত করেন। ১২ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসা ওমর ২০১৯ সালে দেশটির প্রথম সোমালি-আমেরিকান ফেডারেল আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহের ওপর নজরদারির পক্ষে তাঁর অবস্থান রয়েছে।
আন্দ্রে কারসন (ইন্ডিয়ানা): ইন্ডিয়ানাপোলিসভিত্তিক সপ্তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে নিজের আসন ধরে রেখেছেন ডেমোক্র্যাট আন্দ্রে কারসন। ২০০৮ সাল থেকে কংগ্রেসের সদস্য তিনি। প্রতিনিধি পরিষদে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী মুসলিম আইনপ্রণেতা হিসেবে পরিচিত কারসনের নীতিগত অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক সহায়তা এবং মানুষের সমান মর্যাদা।
লতিফা সিমন (ক্যালিফোর্নিয়া): ক্যালিফোর্নিয়ার ইস্ট বে এলাকার ১২তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট লতিফা সিমন। একই দলের প্রার্থী জেমি জয়েসকে পরাজিত করে তিনি নিজের আসন ধরে রাখেন। ইসরাইলকে আক্রমণাত্মক অস্ত্র সরবরাহ বন্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার আরেকটি কংগ্রেশনাল আসনে মুসলিম প্রার্থী আয়েশা ওয়াহাবও ভোট গণনার সময় প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে ছিলেন।
মার্কিন রাজনীতিতে নতুন বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে মুসলিম আইনপ্রণেতাদের এই সাফল্য দেশটির রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, গাজায় মানবিক বিপর্যয় এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের দাবিতে সোচ্চার প্রার্থীদের বিজয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও তাৎপর্য বহন করছে।
নতুন নির্বাচিত ও পুনর্নির্বাচিত এসব আইনপ্রণেতা কংগ্রেসে তাঁদের অবস্থান থেকে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, নাগরিক অধিকার এবং মানবিক সহায়তার প্রশ্নে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, এখন সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।
