ডাক্তারদের ভুল পরামর্শের এক লোমহর্ষক কাহিনী

প্রায় ৯ বছর আগের কথা। আমার সন্তানের কোমরে চিন-চিন পেইন, মাঝে-মধ্যে কোমর থেকে হাটু পর্যন্ত ক্রমান্নয়ে যায় সেই পেইনটি। বাচ্চার বয়স তখন ১৬ বছর। সিলেটে এক বছরে কুড়ি জন ডাক্তার দেখালাম। সিলেটে ‘রোগটি চিনতে পারলাম না’ সব ডাক্তার একই কথা বলেন। তারা প্রতেকেই আবার ফিসটা রেখে রেফার্ড করেন অন্য ডাক্তারের কাছে।

পেইন হওয়ার এক বছর পর সোবহানীঘাটস্থ ইবনে সিনা হাসপাতালের ডাক্তারের চেম্বার থেকে আমার স্ত্রী মোবাইলে কল করে কেঁদে কেঁদে বলেন, আমাদের  সর্বনাশ হয়ে গেছে।

আমি ভাবলেশহীন মানুষ। ছিলাম সিলেট মহানগরীর জিন্দাবাজার রাজা ম্যানশনের দীর্ঘ দিনের ছাপার ব্যবসায়ী। কোন বিষয়ে বেশি ভাবতাম না। তাঁর কান্নার মাঝে যা বুঝলাম, আজ রোগ ধরা পড়েছে। টেস্ট করাতে ১৬ হাজার টাকা লেগেছে।

ইবনে সিনার ডাক্তার বলেছেন, বাংলাদেশে শুধুমাত্র ঢাকার একটি মাত্র জায়গায় অপারেশন হয়। দ্বিতীয় কোন স্থানে হয় না। এটি একটি জটিল অপারেশন। ইন্সপাইনাল কড মানে মেরুদণ্ডের হাড্ডি অপারেশন করতে হবে। বাংলাদেশের একটি হাসপাতালে অপারেশন হয়, তবে উন্নত কোন দেশে নিয়ে করাতে পারলে উত্তম হতো।

তারপর ইবনে সিনার ডাক্তারের বর্ণনাকৃত বাংলাদেশের অপারেশনের স্থান ঢাকার একমাত্র নিউরো সাইন্স হাসপাতালে চারজন মিলে যাই। অবশ্য ডাক্তার দেখানোর খরচ মাত্র ১০ টাকা।

চারজন ডাক্তার শুধুমাত্র সিলেট ইবনে সিনার ডাক্তারের রিপোর্ট দেখলেন। তারপরই বললেন যে, এখানে ভর্তি হয়ে অন্তত ১৫/১৬ দিন অপেক্ষা করতে হবে। সিরিয়াল মেন্টেইন করে অপারেশন হবে। অপারেশনের পরে থাকতে হবে মাসখানেক। সংক্ষেপে সব কথা শেষ।

খরচের কথা জানতে চাইলাম। তারা বললেন, যেহেতু হাসপাতালটি সরকারি, সেহেতু অপারেশনের কোন খরচ লাগবে না। শুধুমাত্র ৬/৭ লাখ টাকার ঔষধ পত্র লাগবে। আমাদের পক্ষে দেড় মাস ঢাকায় থাকাটা সম্ভব নয়। আর মন বলছিল, দেখে-শুনে অপারেশন হচ্ছে না। তারা অপারেশনের সিদ্ধান্তটি নিতে মাত্র ৩-৪ মিনিট লাগিয়েছে। যদিও স্বল্প খরচে হয়ে যাচ্ছে অপারেশন। শেষ পযন্ত সব দিক বিবেচনা করে, ওখানে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারলাম না।

আমরা আবারও সিলেট চলে এলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। ইবনে সিনার ডাক্তারের সাথে আবার যোগাযোগ করি। তাকে জিজ্ঞেস করি, সর্বস্ব বিলিয়ে আমরা না হয় অপারেশন করলাম। পুরোপুরি ভালো হবে তো? ডাক্তার বললেন, কোন উন্নত দেশে করালে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর আমাদের দেশে করালে ৬০% সম্ভাবনা ভালো হওয়ার। এত টাকা খরচ করে ভালো হওয়ার নিশ্চয়তা আবার নেই।

ইবনে সিনার ডাক্তার বললেন, ২ মাসের মধ্যে চিকিৎসা না করালে পা-টি ব্যান্ড হয়ে যাবে। এই ব্যান্ড হওয়ার কথাটি বাচ্চার মায়ের খুব ধরেছিল। তিনি ২টি বছর এ নিয়ে আমাকে খুবই শাসনে রাখেন। কিন্তু আমার মন বলছিল, কিচ্ছু হবে না। ২ মাসের জায়গায় ২ বছর চলে গেছে। আর ওদিকে অপারেশন করার পরও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না।

পরবর্তী দুইটি বছর সিলেটে যে ডাক্তারের কাছেই যাই, সে ডাক্তারই বলেন যে, আমার কাছে অপারেশনের সব সরঞ্জাম আছে। আমরা অপারেশন করাতে সক্ষম। অপারেশনে সময় লাগবে নিম্নে ৪ ঘন্টা, আর সবোচ্চ ৮ ঘন্টা। আর টাকা লাগবে ডাক্তারভেদে ১০/১২/১৪ লাখ টাকা। কিন্তু কারো কথায় ভরসা করতে পারছিলাম না। ৪ থেকে ৮ ঘন্টায় বাচ্চাটাকে কী করবে?

তারপরও আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। কেননা এর আগে ইবনে সিনার ডাক্তারের কাছ থেকে জেনেছি যে, বাংলাদেশে একমাত্র একটি জায়গা আছে, যেখানে সে অপারেশন করতে সক্ষম। সেটি হলো নিউরো সাইন্স হাসপাতাল, ঢাকা।

আমার ইচ্ছা ছিল মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল সিঙ্গাপুরে যাওয়ার। সেখানে ২০০৪ সনে বেড়াতে গিয়েছিলাম। নিজ চোখে দেখে এসেছিলাম সেখানের স্বাস্থ্যসেবার মান। তারা একজন রোগীর যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু সময় দেবে, তারপরও রোগ ফাইন্ডআউট করবে। কিন্তু সবার মত না থাকায় আর এগোয়নি।

আমরা যোগাযোগ করি নিউ দিল্লির প্রধান নিউরো সাইন্স হাসপাতালে। তারা অফার করেন সর্বমোট বাংলাদেশী ১৪ লাখ সামথিং টাকায় পুরো অপারেশন করে দেবেন। নিউরোসার্জনের ছবি ও যাবতীয় কাগজ পাঠানো হয় আমার ই-মেইলে। আমরা পাসপোর্ট সহ আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করি।

ইতিমধ্যে আমার যোগাযোগ হয় আমেরিকান এক বন্ধুর সাথে। তিনি আমার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চান। তিনি আমাকে সেখানকার একজন বিশিষ্ট নিউরো সার্জনের সন্ধান দেন। অতঃপর ডাঃ জামুরানোর সাথে যোগাযোগ হয়। তাঁর হিসাবে বাংলাদেশী প্রায় ১৬ লাখ টাকা অপারেশনের খরচ। তিনি তার পিএস ডিনাইস বাসেলের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেন। তিনিও একজন ডাক্তার। ই-মেইলে আমাদের যোগাযোগ চলছিল।

আমার দোকানের ম্যানেজার দিলোয়ার ভাই ছিলেন লন্ডন থেকে ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক ডিগ্রিধারী। তাই ই-মেইলে যোগাযোগে আমাদের যোগাযোগে খুব সুবিধা হয়েছিল।

যোগাযোগের এক পযার্য়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেই নিউরোসার্জন ডাঃ জামুরানোর কাছে মিশিগান সিটিতে যাওয়ার। কিছু আত্মীয় স্বজনরাও সাহস দেন। ডিনাইস বাসেল ও আমার বন্ধু ভিসা পাওয়ার জন্য যাবতীয় কাগজপত্র দেন। এরপর আমেরিকান দূতাবাসের এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ভিসার জন্য আবেদন করি। কিন্তু তারপরও ভিসার আবেদন রিফিউজড হয়।

ইবনে সিনার ডাক্তার বলেছিলেন, দুই মাসে পা ও ব্যান্ড হয়ে যাওয়ার কথা। সেখানে ডাক্তার দেখানোর পর চলে গেছে আরো দুটি বছর মানে মোট তিন বছর। শুধু পায়ে মাঝে মধ্যে সমস্যা করে। সাহস আমাদের অনেকটা বেড়ে গেল।

এরই মধ্যে খবর পেলাম ঢাকা নিউরোসাইন্স হাসপাতালের এক সিলেটি ডাক্তার সপ্তাহে একদিন রোগী দেখেন সোবহানীঘাট ওয়েসিস হাসপাতালে। তাঁর এপয়নমেন্ট নিলাম।

তিন বছরের আমাদের কাছে সিলেট ও ঢাকার ৪২ জন ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখে তিনি হতবাক। এ ছাড়া তিনি আমেরিকা ও ভারতীয় ডাক্তারের কাগজপত্র দেখে হা হা করে হাসেন। তিনি বললেন, আমাদের দেশী ডাক্তাররা আপনার গায়ের চামড়া ছুলাতে চেয়েছিল।

তিনি ইবনে সিনার ডাক্তারের রিপোর্ট দেখিয়ে বললেন, এই রিপোর্টই সমস্যার মূল কারন। প্রথম বছরে ২০ জন সবাই নিজের অপারগতা প্রকাশ করে অন্যজনের কাছে রেফার করেছেন। বাকী দুই বছরে ২২ জন ইবনে সিনার ভুল এই রিপোর্ট দেখে দেখে ট্রিটমেন্ট দিয়েছিলেন। কিন্তু আমরা ট্রিটমেন্ট করাইনি, শুধু ডাক্তারের কথাগুলো শুনেছি আর কি করা যায় ভেবেছি।

সোবহানীঘাটের ইবনে সিনা ক্লিনিকে আজ ৩রা জুলাই ২০২৪ এখন আর এখানে তিনি নেই। তার প্রমোশন হয়েছে। তার জন্য দুইটি বছর হয়রানির শিকার হলাম। তাঁর প্রমোশন প্রশংসনীয়। এখন তিনি সিলেটের উঁচু টাওয়ারের হাসপাতালে রোগী দেখছেন।

ডাক্তার মোহাঃ এনায়েত হোসেন আমাদের কাছে ডাক্তার সমাজের পক্ষ থেকে ক্ষমা চান। বললেন, ডাক্তাররা কেউ পেছনে ফিরে তাকাননি। একজন যে ভুল করেছেন, সবাই সেই ভুল পথেই হেটেছেন। অযথাই আপনাদের কষ্ট দিয়েছেন।

আপনাদের ভাগ্য ভালো যে আপনারা এখনো অপারেশন করেননি। অপারেশন করালে সত্যি সর্বনাশ হয়ে যেত। তার সারা বডি প্যারালাইজড হয়ে যেতো। সে আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারত না। যত দিন বেঁচে থাকত, বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাকে কাটাতে হতো।

কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি। এই ঔষধ এক সপ্তাহ খাওয়ার পর প্রয়োজনে আমাকে এই ফোন নাম্বারে আমাকে জানাবেন। ঔষধ ৮০ টাকার কিনে আমরা বাসায় চলে এলাম। এই ঔষধ ব্যবহারের পর আজ পর্যন্ত কোন সমস্যা হয়নি।

ঢাকা-সিলেট দৌড়াদৌড়ি আর ডাক্তার দেখানো, আমেরিকা এম্বেসির ফি-সহ আমাদের তিন বছরে প্রায় তিন লাখ খরচ হয়ে গিয়েছিল চিকিৎসা না করেই। এখন তার আর কোন সমস্যা নেই। আল্লাহর রহমতে সন্তানটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে এই ৮০ টাকার ঔষধ সেবন করে।

লেখকঃ মঈনুল হক মঈন
সিলেট।। 

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *