ইতিহাসের চোরাবালিতে দিশেহারা বিএনপিঃ আওয়ামী ফর্মুলায় কি রাজনৈতিক মুক্তি সম্ভব?

ড. লোকমান খান  
২৪ জানুয়ারি ২০২৬

রাজনীতির ক্যালেন্ডারে এখন ২০২৬ সাল চললেও বিএনপির ঘড়ি যেন এখনো আটকে আছে একাত্তরের সেই চেনা চোরাবালিতে। যে ‘ইতিহাসের কার্ড’ খেলে আওয়ামী লীগ একসময় দেশকে রাজনৈতিকভাবে জিম্মি করেছিল, আজ বিএনপিও সেই একই পুরোনো কার্ড বাজিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই প্রকাশ ঘটাচ্ছে।

২০২৬ সালের এক নতুন বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন জাতির প্রত্যাশা ছিল আগামীর অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুশাসনের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, তখন বিএনপি বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগের সেই পরিত্যাক্ত ইতিহাসের রাজনীতি। প্রতিদিনের সভা-সমাবেশে জামায়াত ও একাত্তর নিয়ে যে ভাষায় বিষোদ্গার করা হচ্ছে, তা দেখে প্রশ্ন জাগে—বিএনপি কি সত্যিই জনগণের জন্য রাজনীতি করছে, নাকি আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সেই পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলই নিজের গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে?

সুবিধাবাদের নতুন সংজ্ঞা

বিএনপি এখন উচ্চকণ্ঠে বলছে, জামায়াত মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। তথ্যটি নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উপলব্ধি গত দুই দশকে কেন দেখা যায়নি? গত ১৭ মাসে জামায়াত এমন কী রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করল যে তারা হঠাৎ বিএনপির কাছে ‘অস্পৃশ্য’ হয়ে গেল?

যারা একসময় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করেছে, টানা বিশ বছর রাজপথ ও নির্বাচনের ময়দানে যাদের ছাড়া এক পা-ও এগোয়নি—আজ সেই বিএনপি যখন একাত্তরের দোহাই দেয়, তখন তা নিছক রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। ক্ষমতার ভাগাভাগির সময় কি ৭১-এর ইতিহাস কোথাও হারিয়ে গিয়েছিল? আজ কেন সেই ইতিহাস আবার ‘ফুল-ফোর্স কার্ড’ হয়ে ফিরে এলো?

ক্ষমা ও জনগণের ম্যান্ডেট

একাত্তরে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল পাকিস্তানের পক্ষে। সেই সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে, এবং সেই ভুলের জন্য তারা বারবার জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা হলো—ক্ষমা করার মালিক বিএনপি বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দল নয়। ক্ষমা করার একমাত্র মালিক এই দেশের জনগণ।

জনগণ যদি অতীত কর্মকাণ্ড বিচার করে ব্যালটের মাধ্যমে তাদের সমর্থন জানায়, তাহলে তাতে বিএনপির এত আপত্তি কেন? আওয়ামী লীগও তো একই কৌশলে ‘স্বাধীনতার শত্রু’ কার্ড খেলে বছরের পর বছর গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। তাহলে বিএনপি কি সেই একই ফ্যাসিবাদী পথেই হাঁটতে চায়?

ঘরের শত্রু ও আদর্শিক ভ্রান্তি

বিএনপির জন্য এর চেয়ে বড় পরিহাস আর কী হতে পারে যে, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ বছর ধরে শহীদ জিয়ার নাম ও ইতিহাস মুছে ফেলার যে নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছিল, সেই প্রকল্পের অনেক কারিগর আজ বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ে আসীন। যারা একসময় জিয়ার আদর্শকে ইতিহাসের চোরাবালিতে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, আজ তারাই বিএনপির তথাকথিত ‘থিংক ট্যাংক’ সেজে একাত্তরের জিকির তুলছে।

নিজেদের ঘরের ভেতরের এই আদর্শিক বিভ্রান্তি রেখে বিএনপি যখন অন্যদের ইতিহাসের দোষ দেয়, তখন সচেতন মানুষ হাসবে না কাঁদবে—সেটাই প্রশ্ন।

গন্তব্যহীন এক যাত্রা

নির্বাচনী প্রচারণায় ইস্যু থাকবেই। কিন্তু সেই ইস্যু হওয়া উচিত আগামীর বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক ভিশন। অথচ বিএনপি আজ কেবল ইস্যুভিত্তিক, নেতিবাচক রাজনীতিতে ব্যস্ত। তাদের বর্তমান কৌশল দেখে মনে হয়, আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতির জায়গা দখল করতে গিয়ে তারা নিজেরাই ‘আওয়ামী লীগে’ রূপান্তরিত হচ্ছে।

বিএনপির এই কথিত থিংক ট্যাংকগুলো আসলে দলটিকে ধীরে ধীরে খাদে ঠেলে দিচ্ছে। এই আত্মঘাতী রাজনীতি যদি চলতেই থাকে, তাহলে বিএনপি যখন পতনের শেষ প্রান্তে পৌঁছাবে, তখন হয়তো সংশোধনের আর কোনো সুযোগই অবশিষ্ট থাকবে না।

লেখকঃ
বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, গবেষক এবং শিক্ষাবিদ। 

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *