সিলেট প্রতিনিধি: সাফল্যের আনন্দ, নতুন স্বপ্ন ও শিক্ষাজীবনের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার দাখিল পরীক্ষার্থীদের স্মারক ‘উদ্ভাস’-এর মোড়ক উন্মোচন ও কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
জামেয়ার প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিল শিক্ষার্থীদের অর্জনের আনন্দ, শিক্ষকদের ভালোবাসা এবং ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবন নিয়ে প্রত্যাশার আবহ। দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি বক্তারা তাদের আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে শাহজালাল জামেয়ার শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব জনাব মোস্তাফিজুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার সহকারী রেজিস্ট্রার মো. ইকবাল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. লুৎফুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব মোস্তাফিজুর রহমান দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, দাখিলের এই সাফল্য শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও এটি শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি নয়; বরং উচ্চতর শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, দাখিলে অর্জিত সাফল্যকে ভিত্তি করে সবাইকে আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হবে এবং উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নয়, জ্ঞান, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধে নিজেদের সমৃদ্ধ করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, মাদরাসা শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো জ্ঞানী, নৈতিক ও আদর্শ মানুষ তৈরি করা। শিক্ষার্থীরা যেন ভবিষ্যতে দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারে, সেদিকে তাদের মনোযোগী হতে হবে।
প্রধান অতিথি শাহজালাল জামেয়ার শিক্ষা পরিবেশের প্রশংসা করে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি মো. ইকবাল বলেন, দাখিল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের বিষয়। তবে এই সাফল্যকে আরও বড় অর্জনে রূপ দিতে হলে তাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর জীবনে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি উচ্চমাধ্যমিক ও পরবর্তী উচ্চশিক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।
তিনি ‘উদ্ভাস’ স্মারকের প্রশংসা করে বলেন, এটি শিক্ষার্থীদের বর্তমান সাফল্যের স্মারক হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তাদের শিকড় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা মনে করিয়ে দেবে।
সভাপতির বক্তব্যে জামেয়ার প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. লুৎফুর রহমান শিক্ষার্থীদের দাখিল পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সাফল্যে শিক্ষকরা যেমন আনন্দিত হন, তেমনি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেক প্রত্যাশা থাকে।
তিনি বলেন, “দাখিল তোমাদের পথচলার শেষ নয়। বরং এখান থেকেই তোমাদের সামনে আরও বড় পথ খুলে যাচ্ছে। তোমরা সবাই আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হবে, ভালোভাবে পড়াশোনা করবে এবং নিজেদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করবে।”
প্রিন্সিপাল শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানিয়ে বলেন, শাহজালাল জামেয়া তাদের দাখিল পর্যন্ত শিক্ষা দিয়েছে, এখন আলিমসহ পরবর্তী পর্যায়েও তাদের শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার সুযোগ রয়েছে। তাই সবাইকে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জামেয়ায় আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, “তোমরা শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করবে না, ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে। তোমাদের জ্ঞান, চরিত্র ও কর্মের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণকর মানুষ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলবে।”
অনুষ্ঠানে জামেয়ার উপাধ্যক্ষ মাওলানা সৈয়দ ফয়জুল্লাহ বাহার, উপাধ্যক্ষ (অতিরিক্ত) মাওলানা কমর উদ্দিন, মুহাদ্দিস মাওলানা হাবীবুল্লাহ, সহকারী অধ্যাপক (ইংরেজি) জনাব সালাহ উদ্দিন আজমান, সহকারী অধ্যাপক (উদ্ভিদবিদ্যা) মো. ফারুক মিয়া, সহকারী অধ্যাপক (গণিত) আব্দুল মোতালেব ইবনে কাবেদ, জামেয়ার নাজিরের গাঁও শাখার ইনচার্জ মাওলানা মাহমুদুর রহমান দিলাওয়ার এবং দশম শ্রেণির শ্রেণি শিক্ষক মাওলানা সাইফুর রহমান বক্তব্য রাখেন।
শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দাখিল পরীক্ষার সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানান এবং তাদের আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীদের আজকের অর্জন তাদের ভবিষ্যৎ সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন প্রয়োজন আরও মনোযোগ, অধ্যবসায় ও নিয়মিত পড়াশোনা।
শিক্ষকদের বক্তব্যে উঠে আসে শিক্ষার্থীদের প্রতি দীর্ঘদিনের মমতা, তাদের সাফল্য নিয়ে গর্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রত্যাশার কথা। প্রিয় শিক্ষার্থীদের আরও বড় সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানে অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
‘উদ্ভাস’ যেন সাফল্য ও স্বপ্নের স্মারক
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দাখিল পরীক্ষার্থীদের স্মারক ‘উদ্ভাস’-এর মোড়ক উন্মোচন। প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি ও সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকটির মোড়ক উন্মোচন করেন।
‘উদ্ভাস’ শুধু একটি স্মারক প্রকাশনা নয়, এটি শিক্ষার্থীদের দাখিল পর্যায়ের শিক্ষা, বন্ধুত্ব, সহপাঠী, শিক্ষক এবং জামেয়াকে ঘিরে নানা স্মৃতির সংকলন। একই সঙ্গে এটি তাদের ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশারও প্রতিচ্ছবি।
কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা
অনুষ্ঠানে দাখিল পরীক্ষায় কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও সম্মাননা প্রদান করা হয়। অতিথিবৃন্দ কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল সাফল্যের আনন্দ। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে গর্ব ও ভালোবাসা। কৃতি শিক্ষার্থীদের সাফল্য উপস্থিত অন্য শিক্ষার্থীদেরও আরও ভালো ফলাফল অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত করে।
বক্তারা বলেন, আজ যারা ভালো ফলাফল করেছে, তাদের সাফল্য অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা। প্রত্যেক শিক্ষার্থী যদি নিয়মিত পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়কে জীবনের অংশ করে নিতে পারে, তাহলে তারাও ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অর্জন করতে পারবে।
জামেয়ার বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন
অনুষ্ঠান শেষে প্রধান অতিথি জনাব মোস্তাফিজুর রহমান, বিশেষ অতিথি মো. ইকবাল এবং অন্যান্য অতিথিবৃন্দ জামেয়ার বিভিন্ন শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করেন।
এ সময় তারা শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, পাঠদান কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। অতিথিবৃন্দ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধে নিজেদের গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শনের সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অতিথিদের আন্তরিক কথোপকথনে প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অতিথিরা জামেয়ার শিক্ষা কার্যক্রম ও পরিবেশের প্রশংসা করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন।
সামনে আরও বড় পথ
দাখিলের সাফল্যকে উদযাপন করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান মূলত শিক্ষার্থীদের থেমে যাওয়ার নয়, আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান হয়ে উঠেছে। ‘উদ্ভাস’ তাদের বর্তমান অর্জনের স্মারক হলেও এর পাতায় যেন লেখা হয়েছে ভবিষ্যতের আরও বড় স্বপ্নের গল্প।
শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রত্যাশা, আজকের এই দাখিল উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সবাই আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হবে এবং শাহজালাল জামেয়ার সুশিক্ষা, আদর্শ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় নিজেদের আরও যোগ্য ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।
সাফল্যের এই আনন্দময় দিনে তাই বিদায়ের কোনো সুর ছিল না। বরং ছিল নতুন শ্রেণি, নতুন স্বপ্ন, নতুন লক্ষ্য এবং আরও সুন্দর ভবিষ্যতের পথে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
