মারাত্মক ব্রেইন স্ট্রোক থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মঈনুল হকের আত্মকথা

সিলেটের রাজা ম্যানশনের বিশিষ্ট ছাপাখানা ব্যবসায়ী জনাব মঈনুল হক প্রায় তিন বছর আগে মারাত্মক ব্রেইন স্ট্রোকের শিকার হয়েছিলেন। ডাক্তার এবং আপনজনেরা তাঁর আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। সম্প্রতি মুক্তবাংলার ইমেইলে তিনি তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে দীর্ঘ একটি লেখা প্রেরণ করেছেন। তাঁর লেখাটি হুবহু নিম্নে উল্লেখ করা হলোঃ

”মূল চিকিৎসা দিতে আড়াই বছর  দেরি হলো কেনো ?”

আমি গত ১২/১১/২০২০ ইংরেজি তারিখে ব্রেইন স্ট্রোক করি। তখন ভোর ৫টা। তার ১ ঘন্টার মাঝে ভোর ৬টায় আমাকে আমার আপনজনরা চিকিৎসালয়ে নিয়ে যান। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত একটি চিকিৎসালয়ে ছিলাম। আমাকে পরীক্ষার নামে শুধু সময়ক্ষেপন  করা হয়। যখন জানলাম, আজ রাতে আর ডাক্তার আসবেন না। আগামীকাল দুপুরে ডাক্তার আসার পরে চিকিৎসা শুরু হবে, সাথে সাথে অন্য চিকিৎসালয়ে যেতেই চিকিৎসা আরম্ভ। স্ট্রোক হওয়ার চার ঘন্টার মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে স্বাভাবিক জীবন যাপন করা যেতো কিন্তু ১৫ ঘন্টা বিলম্বে চিকিৎসা শুরুর কারণে আমাকে আজ চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। এক মাস আমি অজ্ঞান ছিলাম। আরো ১৪টি মাস নাক দিয়ে খাবার চলছিল বিভিন্ন ক্লিনিক ও হাসপাতালে। তাই পুরো সময়টিতে আর কিছু ভাবনা ছিল না, শুধু বেঁচে থাকা ছাড়া। ডাক্তার-থেরাপিষ্টদের মতে – ‘ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার ছয় মাস পরে হাতের কোষ শুকিয়ে যায়, আর হাতটি সুস্থ হওয়া অসম্ভব।’ কোষ জিনিসটা কী তা এখনও বুঝতে পারিনি। হয়ত অলৌকিক কিছু হবে। সিলেটের ২০/২২ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, ৪০/৫০ জন থেরাপিষ্টের কথাটি সম্পূর্ণ অসত্য। তারা একই সূরে সবাই কথা বলেন। ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। আর চিকিৎসা অসম্ভব। আর প্রথমে ডাক্তাররা বলেছিলেন, আমি সুস্থ হতে পারব না। তিন থেকে ছয় মাসের মাঝে মারা যাব। আর চিকিৎসা করিয়ে ফায়দা নেই। তিন মাসে সিরিয়াল পাওয়া ঢাকার ডাক্তার দীন মোহাম্মদ বলেছিলেন, ‘সময় চলে গেছে , সময়মতো আসলে দেখা যেত।’ তিন মাসে সময় পেয়েছিলাম তিন মিনিট। তিন মিনিট পরে তাঁর চেম্বার থেকে চলে আসতে হলো। সেখানে সিলেটের মেয়র আরিফ সাহেবকে পেয়েছিলাম, তাঁর সাথে ৫/৭ মিনিট সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছিল। ‘সময় চলে গেছে’ কথাটি ছিল মারাত্মক ভুল। কথাটি শুনে আমার আপনজনদের মন ভেঙে যায়। তারা আর চিকিৎসায় অমনোযোগী হয়ে যান। যেহেতু আমি কখন মারা যাব, তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। দিনে দিনে তাদের মাঝে বেড়েছে হতাশা। কথাটির জন্য ডাক্তাররাই দায়ী। না হলে আমার স্বজনরা তখনই দেখত, কোন কিছু করা যায় কি না? আর কোনো ডাক্তার-থেরাপিষ্ট আছে কি না? আজ থেকে দুই বছর পূর্বে সিলেটের একটি মেডিকেল কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধানের কাছে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমরা আপনাকে শুধু বাঁচানোর জন্য চেষ্টা করছি। হাত নিয়ে কোন চিন্তা করছি না। একটা হাততো আছে। যাদের দুটি হাত নেই তারাও তো বেঁচে থাকে। আর রাইসটোপ যখন মনে করা যাবে আর প্রয়োজন নেই, তখনই খুলে দেয়া হবে। আর হ্যা, ১৫ মাস পরে রাইসটোপ খুলা দেয়া হয়! আর আমার হাসপাতালের শয্যাশায়ী জীবনের আল্লাহ ইতি টানেন। আমি স্ট্রোক করি ১২ই নভেম্বর ২০২০ সালে আর হাসপাতালের রাইসটোপ থেকে মুক্তি লাভ করি পনেরো মাস পরে। মানিক পীর (র.) রোডের জালালাবাদ পঙ্গু হাসপাতালের ডাক্তার দুই মাস থেরাপি দেয়ার পর দ্বি-তলায় তার চেম্বারে আমাদের ডেকে নেন। তার মতে আমাদের চিকিৎসার আর প্রয়োজন নেই। অযথাই খরচ হচ্ছে। যে কয় মাস হায়াত আছে, সে কয় মাস বাঁচব। আমার জন্য আর খরচ করার প্রয়োজন নেই। আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করে বিদায় দেন। হায়রে দয়া-মায়া! তারপর থেকে দেশ-বিদেশে থেকে কল দিয়ে অনেকেই জানতে চাইতেন, আমি এখনও বেচে আছি নাকি মরে গেছি। তিন বছর হয় আমি  আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছি। এখনও মরি নি! বিগত দুই বছর কোন ডাক্তার অথবা থেরাপিষ্ট আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে চায়নি। কেননা তাদের মতে ছয় মাস পরে আর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা চলে না। আর দ্বিতীয় কোন চিকিৎসা নেই। তিন বছর পরে সৌভাগ্যবশতঃ একজন মানবিক থেরাপিস্ট পেয়েছি, যার কাছে দুই মাস থেরাপী দিয়ে আজ আমি প্রায় ৫০% সুস্থ। হাতটি কিছুটা হলেও নাড়াতে পারি। প্রায় অনেকটা সুস্থ জীবন যাপন করছি। আমার আপনজনরা দুইটি বছর আমার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। আপাতত বেচে থাকার আশা বেড়েছে। তাই চিকিৎসার দিকে মন দিয়েছেন। সে সময় চিকিৎসায় মন দিলে হয়তো এতো দিনে ভালো হয়ে যেতাম।

By admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *