‘ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলেন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে শহীদ তাইম’
ঢাকা: উত্তাল জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায় হয়ে আছে। সেদিন সকালে নাস্তা শেষ করে মাকে শুধু বলেছিলেন, “আসি মা।” মা পারভিন আক্তার ভেবেছিলেন, ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়তো ফিরে আসবে তার ১৯ বছরের ছেলে ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইম। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন হয়েছিল নিথর দেহে, গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত অবস্থায়।
সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা ছিল, যে তরুণের স্বপ্ন ছিল বাবার মতো পুলিশ হয়ে দেশের সেবা করা, তাকেই গুলি করে হত্যা করা হয় পুলিশের গুলিতে।
শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে চলমান আন্দোলন দমন করতে ২০২৪ সালের ২০ জুলাই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে কারফিউ জারি করে। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কারফিউ প্রত্যাখ্যান করে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে। সেদিন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কর্মরত পুলিশের জ্যেষ্ঠ উপপরিদর্শক (এসআই) ময়নুল হোসেনের ছেলে ইমাম হাসান ভূঁইয়া তাইম।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমদিকে আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল। একপর্যায়ে তাইম, রাহাত হোসাইন ও শাহরিয়ার আজাদ পাশের লিটন স্টোরে গিয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করেন। পরে তারা আবার সড়কে ফিরে আসেন। ঠিক তখনই আন্দোলনকারীদের ওপর অভিযান শুরু করে পুলিশ।
পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং গুলিতে মুহূর্তেই যাত্রাবাড়ী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একই সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সশস্ত্র হামলার অভিযোগও ওঠে। জীবন বাঁচাতে তাইম ও তার বন্ধুরা আবার লিটন স্টোরে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানেও রক্ষা হয়নি।
তাইমের বন্ধু রাহাত হোসাইন জানান, পুলিশ দোকানের শাটারে আঘাত করে জোরপূর্বক দোকান খুলিয়ে তাদের বের করে আনে। দোকান মালিককেও মারধর করা হয়। এরপর তাইম ও রাহাতকে দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করে চার পুলিশ সদস্য আটকে রাখে।
রাহাতের ভাষ্য, একপর্যায়ে পুলিশ তাদের দৌড়ে পালাতে বলে। তিনি ভয় পেয়ে যেতে না চাইলেও তাইম দৌড় দেন। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে দুই পুলিশ সদস্য গুলি চালায়। গুলি তাইমের শরীরের পেছন দিক দিয়ে ঢুকে সামনের অংশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেও প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেছিলেন তাইম। কিন্তু কিছুদূর গিয়ে সড়কে লুটিয়ে পড়েন। রাহাত তাকে উদ্ধার করতে গেলে নিজেও গুলিবিদ্ধ হন। তার পায়ে গুলি লাগে।
রাহাত আরও জানান, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাইম আতঙ্কিত কণ্ঠে নিজের বাবার পরিচয় দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তার ছেলে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির সাদা পোশাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং খুব কাছ থেকে তাইমকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি করা হয়।
এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, গুলিবিদ্ধ তাইমকে এক বন্ধু পেছন থেকে টেনে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, আর সামনের দিক থেকে এক পুলিশ সদস্য গুলি চালিয়ে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত বন্ধুটি ব্যর্থ হয়ে সরে যেতে বাধ্য হন। রক্তাক্ত অবস্থায় সড়কে পড়ে থাকেন তাইম। ভিডিওটি পরবর্তীতে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত দলিলে পরিণত হয়।
অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তাইমকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছেন তার বন্ধু শাহরিয়ার আজাদ। তার গায়ে ছিল পুলিশের লোগোসংবলিত একটি টি-শার্ট, যা তার পুলিশ সদস্য বাবার। কিন্তু তাকেও মারধরের অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।
গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার বলেছিলেন, তিনি পুলিশ সদস্যদের অনুরোধ করে বলেছিলেন, “ও পুলিশের ছেলে, ওরে বাঁচান।” জবাবে এক পুলিশ সদস্য বলেন, “বাঁচাইতাছি, আগে তুই এখান থেকে যা, না হলে তুইও গুলি খাইবি।” এরপর প্রাণ বাঁচাতে সেখান থেকে সরে গিয়ে তিনি তাইমের পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে দেন।
এরই মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ তাইমকে একটি ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এসে মা পারভিন আক্তার ছেলেকে আর পাননি। তিনি দেখেছিলেন শুধু রক্তের দাগ।
পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে বাবা এসআই ময়নুল হোসেন ও মা পারভিন আক্তার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। হাতে ছিল ছেলের ছবি। যাকেই পাচ্ছিলেন, জিজ্ঞেস করছিলেন, “এই ছেলেটাকে কী দেখেছেন?”
এক সাংবাদিকের পরামর্শে তারা হাসপাতালের মর্গে যান। সেখানে গিয়ে দেখতে পান, তাদের সন্তানের নিথর দেহ। বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে গুলিতে। সেই দৃশ্য দেখে মা পারভিন অজ্ঞান হয়ে পড়েন। স্তব্ধ হয়ে যান বাবা ময়নুল হোসেন।
পরে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে ফোন করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ময়নুল হোসেনের করা প্রশ্নটি সারা দেশে আলোচিত হয়। তিনি বলেছিলেন, “স্যার, আমার ছেলে আর নেই। বুলেটে ওর বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে। একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার?” সেই ফোনালাপের সংবাদ ও অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন আরও বাড়িয়ে দেয়।
তাইমের বড় ভাই রবিউল বলেন, তাদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত। বাবা ২৭ বছর ধরে পুলিশে কর্মরত। দাদা ছিলেন পুলিশ সদস্য, চাচা সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। তাইমও পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।
রবিউলের ভাষায়, “আমার ভাইও পুলিশ হতে চাইত। অথচ তাকেই পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমরা এই হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
উত্তাল জুলাইয়ের সেই রক্তাক্ত অধ্যায়ের এক বছর পরও তাইমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের শোকগাঁথা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার এক আলোচিত প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ‘আসি মা’ বলে ঘর থেকে বের হওয়া সেই তরুণের আর ঘরে ফেরা হয়নি। তার অসমাপ্ত স্বপ্ন, পরিবারের আহাজারি এবং মৃত্যুর ভিডিওচিত্র আজও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
