আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গা সমাজের আহ্বান
মুক্তবাংলা নিউজ ডেস্ক | ২২ অক্টোবর ২০২৫
আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার ও জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা অনুসরণ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ৮৩টি রোহিঙ্গা নাগরিক সমাজ সংগঠন যৌথভাবে এক ঐতিহাসিক বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এতে আরাকান রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তর্নিহিত অধিকার পুনঃনিশ্চিত করা হয়েছে এবং United League of Arakan (ULA) ও এর সশস্ত্র শাখা Arakan Army (AA)–এর একক আধিপত্য ও রোহিঙ্গা পরিচয় মুছে ফেলার প্রচেষ্টাকে কঠোরভাবে নিন্দা জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “রোহিঙ্গারা রোহাং (আরাকানের প্রাচীন নাম) থেকে উদ্ভূত আদিবাসী জনগোষ্ঠী। আরাকান রাজ্য সব জাতিগোষ্ঠীর যৌথ মাতৃভূমি—এটি কোনো জাতিগত আধিপত্য বা সামরিক শাসনের ক্ষেত্র হতে পারে না।”
রোহিঙ্গা জনগণের উদ্বেগ
যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, রোহিঙ্গারা দীর্ঘ দশক ধরে সুসংগঠিত নির্যাতন, রাষ্ট্রহীনতা ও গণহত্যার শিকার। সম্প্রতি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ULA/AA নিজেদের আরাকান রাজ্যের বৈধ শাসক হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করেছে।
রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো এই দাবিকে “অবৈধ ও প্রতারণামূলক” আখ্যা দিয়ে জানায়, “ULA/AA রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা জনগণের নয়, বরং সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে।”
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ
২০২৫ সালের ২৩ জুলাই প্রকাশিত Fortify Rights–এর প্রতিবেদনে AA–এর বিরুদ্ধে ব্যাপক অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনেক রোহিঙ্গা পুরুষ ও নারীকে হত্যা করা হয়, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিরশ্ছেদও করা হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।
অন্যদিকে জাতিসংঘের A/HRC/60/20 প্রতিবেদন নিশ্চিত করে যে ২০২৪ সালের মে থেকে আগস্টের মধ্যে বুথিডং ও মংডু এলাকায় AA যোদ্ধারা রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে গোলাবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ চালায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এই কর্মকাণ্ড কোনো রক্ষকের নয়, বরং অপরাধীর প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন সব শক্তির বিরোধিতা করি যারা রোহিঙ্গা জনগণের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে।”
বার্মিজ সামরিক জান্তাকেও দায়ী করা হয়
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ULA/AA–এর সমালোচনা মানে বার্মিজ সামরিক জান্তার প্রতি সমর্থন নয়। বরং জান্তা সরকারও একইভাবে গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। উভয় পক্ষকেই আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় জবাবদিহির মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয়।
আইনি ও মানবিক প্রভাব
রোহিঙ্গা সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, “ULA/AA–কে স্বীকৃতি দেওয়া চলমান যুদ্ধাপরাধ তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করবে।”
তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ)–এর মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী মানবাধিকার লঙ্ঘন বা যুদ্ধাপরাধে জড়িত, তাকে বৈধতা দেওয়া মানবতার প্রতি অবিচার হবে।”
আরাকানের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিভঙ্গি
সংগঠনগুলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ আরাকান গঠনের আহ্বান জানিয়ে বলে,
“রোহিঙ্গা, রাখাইন, কামেইন, ম্রু ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে সমঅধিকার ও পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে। আরাকানের ভবিষ্যৎ সকল জাতির যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে হবে।”
তারা ULA/AA–এর প্রতি চার দফা আহ্বান জানিয়েছে—
- রোহিঙ্গা বেসামরিকদের ওপর হামলা, জোরপূর্বক নিয়োগ ও সহিংসতা বন্ধ করা;
- রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ স্বীকার ও দায় গ্রহণ করা;
- পুনর্মিলন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার লক্ষ্যে আন্তরিক সংলাপ শুরু করা;
- সকল জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে একটি যৌথ আরাকান গঠন করা।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
যৌথ বিবৃতিতে জাতিসংঘ, সদস্য রাষ্ট্র ও কূটনৈতিক মিশনগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে—
- ULA/AA–এর শাসন দাবি প্রত্যাখ্যান করুন;
- এমন শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করুন, যা সব জাতিগোষ্ঠীর অধিকারকে সম্মান করে;
- মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা থেকে বিরত থাকুন;
- ন্যায়বিচার, পুনর্মিলন ও স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করুন।
বিবৃতির শেষাংশে বলা হয়,
“আরাকানের সকল জাতিগোষ্ঠী, বিশেষ করে আদিবাসী রোহিঙ্গারা, ন্যায়বিচার, সুরক্ষা এবং মর্যাদার সঙ্গে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরে যাওয়ার অধিকার রাখে। ন্যায়বিচার ছাড়া কখনো প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।”
স্বাক্ষর ও যোগাযোগ
এই যৌথ বিবৃতিতে মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, নিউজিল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশের ৮৩টি রোহিঙ্গা নাগরিক সমাজ সংগঠন স্বাক্ষর করেছে।
প্রধান সমন্বয়কারীর দায়িত্বে আছেন মোহাম্মদ আমিন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO), Rohingya Centre UK (RCUK)।
যোগাযোগঃ
📞 +44 7475 237037
📧 mohammed.a@rcuk.org
সূত্র: Rohingya Centre UK (RCUK) প্রেস বিবৃতি, অক্টোবর ২০২৫
