মাটি, মানুষ ও মানবতার অগ্রযাত্রী: সারওয়ার হোসেইনের জীবন ও কর্মের আলেখ্য
শিকড়ের টান, শিক্ষার আলো, সাংবাদিকতা, প্রবাসী নেতৃত্ব এবং মানবকল্যাণের পথে এক দীর্ঘ কর্মময় যাত্রার গল্প।
শিকড় থেকে নেতৃত্বের অভিযাত্রা
কিছু মানুষের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং একটি সমাজের ইতিহাস, একটি জনপদের স্বপ্ন এবং একটি প্রজন্মের প্রেরণার প্রতিচ্ছবি। তাঁরা পদ-পদবি কিংবা পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন তাঁদের কর্ম, সততা, ত্যাগ এবং মানবিকতার মাধ্যমে। তাঁদের জীবনগাথা নতুন প্রজন্মকে শেখায় কীভাবে নিজের স্বপ্নকে মানুষের কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়, কীভাবে ব্যক্তিগত অর্জনকে সমাজের উন্নয়নের হাতিয়ারে পরিণত করা যায়।
সারওয়ার হোসেইন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, সমাজসেবা এবং মানবকল্যাণের এক অনন্য সমন্বয়। তিনি একই সঙ্গে একজন শিক্ষাবিদ, সংগঠক, সাংবাদিক, গণমাধ্যম উদ্যোক্তা, সমাজসেবক এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন সুপরিচিত নেতৃত্ব। তাঁর জীবনকে কেবল পেশাগত পরিচয়ে মূল্যায়ন করলে ভুল হবে; কারণ তাঁর প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মানুষ, সমাজ এবং মাতৃভূমির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।
প্রবাসে দীর্ঘদিন বসবাস করলেও জন্মভূমির প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো ম্লান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তাঁর সম্পদ বা পদমর্যাদায় নয়; বরং তিনি মানুষের জন্য কী রেখে যেতে পারলেন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
এই বিশ্বাসকে ধারণ করেই তিনি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে দায়িত্বকে দেখেছেন সেবার সুযোগ হিসেবে এবং নেতৃত্বকে দেখেছেন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি অঙ্গীকার হিসেবে।
জন্ম ও পারিবারিক শিকড়
১৯৭৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিংচাপইড় গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সারওয়ার হোসেইন। তাঁর পিতা আলহাজ্ব আরজক আলী সমাজে সম্মানিত ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একজন সালিশ ব্যক্তিত্ব। মা মরহুমা আম্বিয়া বেগম ছিলেন স্নেহময়ী, ধর্মপরায়ণ এবং সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক গুণাবলি বিকাশে নিবেদিতপ্রাণ একজন আদর্শ মা।
পারিবারিক পরিবেশেই তিনি সততা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, মানবিকতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা লাভ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতাই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
গ্রামবাংলার নির্মল প্রকৃতি, মানুষের আন্তরিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির পরিবেশে বেড়ে ওঠা সারওয়ার হোসেইনের চিন্তা ও ব্যক্তিত্বের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন কৌতূহলী, সৃজনশীল এবং নেতৃত্বপ্রবণ। সমবয়সীদের সঙ্গে খেলাধুলার পাশাপাশি বই পড়া, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সমাজের বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগে অংশগ্রহণ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
আজও তিনি গর্বের সঙ্গে নিজের পরিচয় দেন সিংচাপইড় গ্রামের সন্তান হিসেবে। প্রবাসে বহু বছর কাটিয়েও জন্মভূমির প্রতি তাঁর আবেগ, দায়িত্ববোধ এবং ভালোবাসা কখনো কমেনি। বরং জীবনের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে তিনি তাঁর গ্রামের মানুষ এবং শিকড়ের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
শিক্ষাজীবনের ভিত্তি
সারওয়ার হোসেইনের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অধ্যবসায়ী, মেধাবী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ একজন শিক্ষার্থী। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর আগ্রহ খুব অল্প বয়সেই তাঁকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার গুমদন্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৯২ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) সম্পন্ন করেন। এরপর সিলেট সরকারি কলেজ থেকে ১৯৯৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) এবং সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ থেকে ১৯৯৭ সালে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি সিলেট ল’ কলেজে ভর্তি হন। আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ছাত্ররাজনীতি, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক নেতৃত্বেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৯ সালে সিলেট ল’ কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে মাহবুব-মহসিন-সারওয়ার প্যানেল থেকে অংশগ্রহণ তাঁর নেতৃত্বের প্রতি সহপাঠীদের আস্থারই প্রতিফলন।
শিক্ষাজীবনের এই সময়েই তিনি উপলব্ধি করেন, শিক্ষা কেবল চাকরি বা ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়; বরং সমাজ পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নেতৃত্বের সূচনা
কৈশোর থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি সারওয়ার হোসেইনের ছিল গভীর অনুরাগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে উন্নত করতে হলে শিক্ষার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ছাত্রজীবনে তিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন দিশারী শিল্পী গোষ্ঠী-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি অসংখ্য তরুণকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করেন।
একই সময়ে তিনি জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ফুলকুঁড়ি আসর-এর কার্যক্রমের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। শিশু ও কিশোরদের নৈতিক শিক্ষা, সাহিত্যচর্চা এবং সৃজনশীল বিকাশে এই সংগঠনের কার্যক্রম তাঁর চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে।
তিনি বুঝতে পারেন, সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর শক্তি হলো শিক্ষিত, সচেতন এবং সংস্কৃতিমনা তরুণ সমাজ। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে আরও বড় উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে।
দক্ষিণ ছাতক সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ: এক স্বপ্নের সূচনা
১৯৯৮ সাল। সদ্য স্নাতক শেষ করা এক তরুণের মনে তখন একটি স্বপ্ন। গ্রামের মেধাবী তরুণ-তরুণীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, কিন্তু তাঁদের সাহিত্যচর্চা বা সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য কোনো সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম নেই।
এই শূন্যতা থেকেই সারওয়ার হোসেইন প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ ছাতক সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ (ডিসিএস)।
সেই সময় গ্রামবাংলায় সাহিত্যচর্চার জন্য এমন একটি উদ্যোগ ছিল অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি দ্রুত তরুণদের একটি প্রাণবন্ত মিলনমেলায় পরিণত হয়।
ডিসিএস-এর উদ্যোগে নিয়মিত সাহিত্যসভা, কবিতা পাঠ, আলোচনা অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হতো। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন প্রকাশ, যেখানে স্থানীয় কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষার্থী এবং নতুন লেখকেরা তাঁদের কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও সমাজভিত্তিক লেখা প্রকাশের সুযোগ পেতেন।
অনেক তরুণ প্রথমবারের মতো কলম ধরার সাহস পেয়েছিলেন এই সংগঠনের অনুপ্রেরণায়।
আজও দক্ষিণ ছাতকের অনেক প্রবীণ সাহিত্যপ্রেমী স্মরণ করেন, কীভাবে একদল উদ্যমী তরুণকে সঙ্গে নিয়ে সারওয়ার হোসেইন একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের সূচনা করেছিলেন।
সমাজ গঠনের স্বপ্ন
সারওয়ার হোসেইনের কাছে সংগঠন মানে শুধু সভা-সমাবেশ নয়। তাঁর কাছে সংগঠন ছিল মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একটি বিদ্যালয়।
তিনি বিশ্বাস করতেন, যে সমাজে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিকশিত হয়, সেই সমাজে সহিংসতা, কুসংস্কার এবং বিভাজনের স্থান সংকুচিত হয়ে আসে।
তাই তিনি সবসময় তরুণদের বই পড়তে, চিন্তা করতে, সমাজ নিয়ে ভাবতে এবং মানুষের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছেন।
এই সময়েই তাঁর মধ্যে যে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়েছিল, সেটিই পরবর্তীকালে তাঁকে একজন সফল শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সমাজসংগঠক এবং মানবিক নেতৃত্বে পরিণত করে।
একজন তরুণের সেই স্বপ্ন আজও থেমে নেই। সময়ের সঙ্গে দায়িত্ব বেড়েছে, কর্মক্ষেত্র বিস্তৃত হয়েছে, দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁর কাজের পরিধি প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর পথচলার মূল দর্শন আজও একই রয়ে গেছে: মানুষের জন্য কাজ করাই জীবনের সর্বোচ্চ সার্থকতা।
একতা উচ্চ বিদ্যালয়ের স্বপ্নযাত্রা থেকে প্রবাসের নতুন অধ্যায়
একজন মানুষের জীবনে এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসে, যা তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যারা নিজের সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার, আরামদায়ক জীবন কিংবা ব্যক্তিগত স্বপ্নকে পিছনে রেখে মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন। সারওয়ার হোসেইনের জীবনে একতা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হওয়া ছিল তেমনই একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত, যা আজও সিংচাপইড়সহ আশপাশের এলাকার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
একটি বিদ্যালয়, একটি স্বপ্ন, একটি জনপদের জাগরণ
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ। সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিংচাপইড় ও আশপাশের এলাকায় মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। অনেক মেধাবী ছেলে-মেয়ে শুধু একটি ভালো বিদ্যালয়ের অভাবে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত না। বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষাজীবন মাঝপথেই থেমে যেত।
এমন বাস্তবতায় এলাকার সচেতন মানুষ, শিক্ষানুরাগী এবং প্রবাসীদের মধ্যে একটি স্বপ্ন জন্ম নেয়, নিজ এলাকায় একটি আধুনিক মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু স্বপ্ন দেখাই সহজ, বাস্তবায়ন করা কঠিন। প্রয়োজন ছিল এমন একজন মানুষের, যিনি শুধু নেতৃত্বই দেবেন না, বরং নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবেন।
সেই দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ শিক্ষাবিদ সারওয়ার হোসেইনের কাঁধে।
প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক: দায়িত্ব নয়, এক মহৎ অঙ্গীকার
৩০ নভেম্বর ১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় একতা উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার পরপরই ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে সারওয়ার হোসেইন বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তাঁর সামনে তখন ছিল দুটি পথ।
একদিকে ছিল শহরে থেকে নিজের একাডেমিক ও পেশাগত জীবনকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
অন্যদিকে ছিল অবকাঠামোহীন একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়, যেখানে নেই পর্যাপ্ত অর্থ, নেই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, নেই নিশ্চিত ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা।
তিনি দ্বিতীয় পথটিই বেছে নেন।
মা, মাটি এবং মানুষের টানে তিনি শহরের সম্ভাবনাময় জীবনকে পিছনে রেখে ফিরে আসেন নিজের গ্রামে। প্রবীণ মুরব্বিদের আহ্বানকে তিনি ব্যক্তিগত সম্মানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা মানে শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়; বরং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
বিনা পারিশ্রমিকে এক অসাধারণ সংগ্রাম
আজ যে বিদ্যালয়ের সুদৃশ্য ভবন, সবুজ মাঠ এবং শত শত শিক্ষার্থী দেখে মানুষ মুগ্ধ হন, তার পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ত্যাগ, শ্রম এবং ভালোবাসার ইতিহাস।
সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা সারওয়ার হোসেইন।
বিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন। অর্থের সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তিনি কখনো হতাশ হননি।
তিনি বিনা পারিশ্রমিকে দিনের পর দিন গ্রামে গ্রামে হেঁটে বেড়িয়েছেন।
একটি পরিবারে গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন শিক্ষার গুরুত্ব, আবার অন্য একটি বাড়িতে গিয়ে কিশোরদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন।
কোথাও গিয়ে বিদ্যালয়ের জন্য অনুদান সংগ্রহ করেছেন।
কোথাও আবার প্রবাসী শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়ের জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন।
তাঁর এই অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এলাকার সাধারণ মানুষও বিদ্যালয়টিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেন।
মুষ্টিমেয় শিক্ষক, স্থানীয় জনগণ এবং প্রবাসীদের সম্মিলিত সহযোগিতায় ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ।
একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, একটি প্রজন্মের ভিত্তি নির্মাণ
সারওয়ার হোসেইনের কাছে বিদ্যালয় মানে কেবল শ্রেণিকক্ষ নয়।
তিনি চাইতেন এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলই করবে না, বরং একজন সৎ, মানবিক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
তাই তিনি বিদ্যালয়ের প্রতিটি কার্যক্রমে শৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং চরিত্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবই পড়াতেন না; বরং সমাজ, দেশ এবং মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধও শেখাতেন।
অনেক অভিভাবক পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন, তাঁদের সন্তানদের জীবনে বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে সারওয়ার হোসেইনের সান্নিধ্য।
স্বপ্নের বিদ্যালয়ের আজকের অবস্থান
সময় বদলেছে।
যে বিদ্যালয় একসময় সীমাহীন সংকট নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, আজ সেটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
নান্দনিক প্রবেশদ্বার, তিনতলা একাডেমিক ভবন, বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ এবং সুন্দর শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ আজ বিদ্যালয়টির পরিচিতি বহন করছে।
প্রতিষ্ঠানের এই অগ্রযাত্রা শুধু একটি বিদ্যালয়ের সাফল্য নয়; বরং এটি একটি জনপদের সম্মিলিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতীক।
এই সাফল্যের ইতিহাসে সারওয়ার হোসেইনের নাম প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
মানুষের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
সারওয়ার হোসেইন কখনো নিজের অবদান নিয়ে উচ্চকণ্ঠ নন।
বরং তিনি সবসময় বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান কখনো একজন মানুষের একার প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে না।
স্থানীয় জনগণ, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং প্রবাসীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই একতা উচ্চ বিদ্যালয় আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
এই বিনয়ী মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
প্রবাসের পথে নতুন যাত্রা
২০০২ সালে জীবিকার প্রয়োজনে সারওয়ার হোসেইন প্রবাসে পাড়ি জমান।
অনেকের কাছে এটি ছিল একটি নতুন জীবনের শুরু।
কিন্তু তাঁর কাছে এটি ছিল দায়িত্বের নতুন পরিসর।
নতুন দেশে গিয়ে তিনি নিজের কর্মজীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুখ-দুঃখ, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে খুব কাছ থেকে দেখতে শুরু করেন।
তিনি উপলব্ধি করেন, বিদেশের মাটিতে বসবাস করলেও মানুষ তার ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিকড়কে কখনো ভুলে যেতে পারে না।
এই উপলব্ধিই তাঁকে প্রবাসী কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে।
কমিউনিটির মানুষ, কমিউনিটির নেতা
২০০৭ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের শুরু করেন সারওয়ার হোসেইন। তখন নিজেকে শুধু একজন কর্মজীবী মানুষ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রবাসে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ এবং সচেতন বাংলাদেশি সমাজ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে বিভিন্ন সামাজিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক এবং মানবিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন।
পরবর্তীকালে তিনি গ্রেটার সিলেট কাউন্সিল (জিএসসি) নর্থ রিজিয়নের সহ-সভাপতি, মুসলিম সোসাইটি অফ ব্রাডফোর্ড (এমএসবি)-এর সেক্রেটারি, নর্থ ইংল্যান্ড টিভি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (NEBTRA)-এর অর্গানাইজিং সেক্রেটারি, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সদস্য, সিংচাপইড় ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ইউকের সভাপতি, ফ্রেন্ডলি ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব ইউকের উপদেষ্টা, ছাতক উপজেলা এডুকেশন ট্রাস্ট, ছাতক ইসলামিক সোসাইটি ইউকে, নর্থ বাংলা প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হন।
এসব সংগঠনের মাধ্যমে তিনি প্রবাসীদের পারস্পরিক সহযোগিতা, নতুন প্রজন্মের পরিচয়বোধ, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
শেকড়ের প্রতি অবিচল ভালোবাসা
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও সারওয়ার হোসেইনের হৃদয় আজও পড়ে থাকে তাঁর জন্মভূমি সিংচাপইড়ে।
তিনি বিশ্বাস করেন, একজন মানুষ যত দূরেই যাক, তার শিকড় কখনো তাকে ছেড়ে যায় না।
তাই প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তিনি নিজ এলাকার মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখেছেন।
কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে সহযোগিতা করেছেন, কখনো সামাজিক সংগঠনের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কখনো কোনো অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নীরবে এগিয়ে এসেছেন।
তাঁর কাছে প্রবাস মানে জন্মভূমিকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং আরও শক্তিশালীভাবে নিজের মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ।
এই বিশ্বাসই পরবর্তীকালে তাঁকে এমন একটি উদ্যোগ গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে, যা শুধু একটি গণমাধ্যম নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্য একটি মানবিক ও সামাজিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
সেই উদ্যোগের নাম মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন এবং মুক্তবাংলা চ্যানেল।
মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন, প্রবাসী নেতৃত্ব ও মানবতার সেবায় এক অনন্য অভিযাত্রা
২০০২ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমানোর মাধ্যমে সারওয়ার হোসেইনের জীবনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। কিন্তু তাঁর এই প্রবাসযাত্রা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত জীবনের উন্নয়ন কিংবা কর্মজীবনের নতুন সম্ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তিনি খুব দ্রুত উপলব্ধি করেন যে, প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সুখ-দুঃখ, সংস্কৃতি, পরিচয় এবং সামাজিক বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
প্রবাসে দীর্ঘদিন বসবাস করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, অসংখ্য বাংলাদেশি ব্যক্তি ও সংগঠন নীরবে সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের অনেক অবদানই বৃহত্তর সমাজের সামনে যথাযথভাবে তুলে ধরা হয় না। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং শেকড়ের সম্পর্কও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় একটি বৃহৎ সামাজিক উদ্যোগের স্বপ্ন।
মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন: একটি স্বপ্নের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে সারওয়ার হোসেইনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন। একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর লক্ষ্য ছিল সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিক সহায়তা এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ইতিবাচক সামাজিক উদ্যোগকে উৎসাহিত করা।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি শুরু থেকেই একটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন, সমাজসেবা যেন সাময়িক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টি করে।
তাঁর নেতৃত্বে মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশন শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানবিক সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগে সম্পৃক্ত হয়।
মুক্তবাংলা চ্যানেল: গণমাধ্যমের মাধ্যমে সমাজসেবা
মুক্তবাংলা ফাউন্ডেশনের প্রথম প্রকল্প হিসেবে ২০১৩ সালের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে মুক্তবাংলা চ্যানেল।
প্রথম থেকেই এটি একটি অলাভজনক অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সারওয়ার হোসেইনের লক্ষ্য ছিল, এটি শুধু সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যম হবে না; বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হবে।
পরবর্তীকালে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সংবাদ পরিকল্পনা, অনুষ্ঠান নির্মাণ, সম্পাদকীয় নীতি, সাংগঠনিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর নেতৃত্বে মুক্তবাংলা চ্যানেল বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবন, সংগ্রাম, সাফল্য এবং সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়।
সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল পথচলা
গণমাধ্যমের প্রতি তাঁর আগ্রহ কেবল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে এনটিভি-এর সাংবাদিক হিসেবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরছেন। সংবাদ সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরি এবং কমিউনিটির ইতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
তাঁর সাংবাদিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষের গল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কমিউনিটির অর্জন, সামাজিক সমস্যা, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবিক উদ্যোগ তাঁর প্রতিবেদনে নিয়মিত গুরুত্ব পেয়ে থাকে।
করোনা মহামারিতে মানবিক নেতৃত্ব
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির সময় সারওয়ার হোসেইনের মানবিক ও গণমাধ্যমভিত্তিক নেতৃত্ব বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
যখন গুজব, ভয় এবং অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল, তখন তিনি মুক্তবাংলা চ্যানেলের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে ধারাবাহিক স্বাস্থ্যবিষয়ক টকশোর আয়োজন করেন। করোনা প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা, টিকাদান এবং মানসিক সুস্থতা বিষয়ে এসব অনুষ্ঠান প্রবাসী ও দেশীয় দর্শকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, লকডাউনে কর্মহীন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি নিজ উদ্যোগে এবং বিভিন্ন সামাজিক ও চ্যারিটেবল সংগঠনের সহযোগিতায় খাদ্যসামগ্রী, ফুড প্যাক এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
এই সময় তাঁর ভূমিকা প্রমাণ করে, গণমাধ্যমকে কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম নয়, বরং মানবিক সহায়তার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব।
প্রবাসী সমাজে নেতৃত্বের বিস্তৃত পরিসর
সারওয়ার হোসেইনের কর্মপরিধি গণমাধ্যমের বাইরে আরও বিস্তৃত।
তিনি যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক এবং কল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। গ্রেটার সিলেট কাউন্সিল নর্থ রিজিয়নের সহ-সভাপতি, নর্থ ইংল্যান্ড টিভি রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সদস্য, সিংচাপইড় ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ইউকের সভাপতি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একজন পরিচিত নেতৃত্বে পরিণত করেছে।
তাঁর কাছে সংগঠন মানে কেবল আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম নয়; বরং মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি এবং উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম।
নীরব সমাজসেবা ও মানবিক উদ্যোগ
সারওয়ার হোসেইনের ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর নীরব সমাজসেবা।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকার গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর নির্মাণ, বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল স্থাপন, অসহায় মানুষের চিকিৎসা সহায়তা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর একটি নিয়মিত মানবিক দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। প্রয়োজন হলে তিনি সুদূর প্রবাস থেকে দেশে এসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন।
তাঁর সমাজসেবার বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি প্রচারের চেয়ে কাজকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক সম্প্রীতি
সারওয়ার হোসেইন একজন অনুশীলনকারী মুসলিম। তিনি ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, মানবিকতা এবং সহমর্মিতার আদর্শকে জীবনের অংশ হিসেবে ধারণ করেন।
Muslim Society of Bradford-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তিনি ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝে পবিত্র কুরআনের অনুবাদ, শিক্ষামূলক বই এবং বিভিন্ন প্রকাশনা বিতরণের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখেন।
তাঁর বিশ্বাস, সুন্দর আচরণ এবং মানবিক চরিত্রের মাধ্যমেই মানুষের কাছে প্রকৃত মূল্যবোধ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্ব
সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং কমিউনিটি নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি “ভয়েস ফর গ্লোবাল বাংলাদেশি ইন্টারন্যাশনাল”-এর প্রতিনিধি দলের একজন অন্যতম সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের ভূমিকা” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে আয়োজিত এই বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ, অভিজ্ঞতা এবং সম্ভাবনা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার একটি স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মানুষ, সমাজ এবং মাতৃভূমির প্রতি দায়বদ্ধতার এই ধারাবাহিক যাত্রাই সারওয়ার হোসেইনকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তিনি প্রতিটি দায়িত্বকে মানুষের সেবার একটি সুযোগ হিসেবে দেখেন। আর এই দর্শনই তাঁকে একজন শিক্ষক, সাংবাদিক, সংগঠক এবং সমাজসেবকের সীমা ছাড়িয়ে একজন মানবিক নেতৃত্বে পরিণত করেছে।
লেখকঃ এমদাদুল ইসলাম তালুকদার
শিক্ষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
