বিশ্ব যতই আধুনিক হোক, সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড নির্ধারিত হয় মানুষের প্রতি আচরণের মাধ্যমে। কোনো রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী, কতটা উন্নত কিংবা কতটা প্রভাবশালী, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকার, মর্যাদা ও মানবিক মূল্যবোধকে কতটা সম্মান করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ‘পুশ-ইন’ অভিযোগ সেই মানবিক মূল্যবোধকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
পুশ-ইন বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে জোরপূর্বক অন্য দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধ্য করা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। কারণ, এর সঙ্গে জড়িত থাকে মানুষের নাগরিকত্ব, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং মৌলিক মানবাধিকারের প্রশ্ন।
যদি কোনো ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশি নাগরিক হন, তবে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য দুই দেশের মধ্যে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়া রয়েছে। পরিচয় যাচাই, তথ্য বিনিময় এবং আনুষ্ঠানিক প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব। কিন্তু এসব প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে সীমান্তে নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন সময় এমন অভিযোগও সামনে এসেছে যে পুশ-ইনের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ভারতের নিজস্ব নাগরিকও ছিলেন। যদি এমন ঘটনা সত্য হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; বরং নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে গুরুতর অবহেলার প্রমাণ। একটি রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব তার নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাদের পরিচয় অস্বীকার করে অন্য দেশের ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়, কোনো রাজনৈতিক বিতর্কের উপকরণও নয়। প্রতিটি মানুষের একটি পরিবার আছে, একটি পরিচয় আছে, একটি মর্যাদা আছে। সীমান্তে কাউকে জোর করে ঠেলে দেওয়া মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, তার মানবিক অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা। এ ধরনের আচরণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি স্পষ্ট অবজ্ঞা।
বাংলাদেশ বারবার বলেছে, প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের গ্রহণে তাদের আপত্তি নেই। তবে সেটি অবশ্যই হতে হবে প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এটি একটি যৌক্তিক এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবস্থান। কারণ কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সীমান্তে একতরফাভাবে মানুষ ঠেলে দেওয়া শুধু মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়, রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতিও অসম্মান।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত। কিন্তু পুশ-ইনের মতো কর্মকাণ্ড সেই আস্থাকে দুর্বল করে এবং সীমান্তে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমস্যা থাকতেই পারে, কিন্তু তার সমাধান কখনোই মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে হতে পারে না।
মুক্তবাংলা চ্যানেল মনে করে, সীমান্ত রক্ষার নামে কোনো রাষ্ট্র মানুষের মৌলিক অধিকারকে উপেক্ষা করতে পারে না। আধুনিক বিশ্বে শক্তির প্রকৃত পরিচয় মানুষকে অপমান করার মধ্যে নয়, বরং আইন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখার মধ্যে নিহিত।
সীমান্তে মানুষকে ঠেলে দেওয়া শুধু একটি নীতি নয়, এটি মানবিক বিবেকেরও পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষায় ব্যর্থতা কোনো দেশের জন্যই গৌরবের বিষয় হতে পারে না। বরং এটি সভ্যতার জন্য এক গভীর লজ্জা।
— সম্পাদক
মুক্তবাংলা
